অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-১৭

শেখ রেহানার ইন্টারভিউ করার অ্যাসাইনমেন্ট আমি নিতে চাইনি। কারণ তার হাইট এবং নিরাপত্তার বিষয়ে সংবেদনশীলতা বিষয়ে ধারণা তখনও ছিল। সাপ্তাহিক জনকথা ও সাপ্তাহিক ঝরণায় কাজ করার সুবাদে এ বিষয়টি অনেকের চেয়ে আমার বিবেচনায় ছিল অনেক বেশি।

সে সময় বৈরী রাষ্ট্রে বসবাস করা নিরাপত্তাহীন শেখ রেহানার মুখোমুখী হতে চাইনি। আবার আমার এ বিবেচনার বিষয়টি কালাম মাহমুদকে বলতেও পারছিলাম না। কারণ তিনি কোন মানসিকতার লোক তা আমার জানা ছিল না। আমি এখনও মনে করি ৭৫-এর বেনিফিসারি চক্র নানান পরিচয়ে সব সময়ই সক্রিয় ছিল, নিশ্চয়ই এখনো আছে। আবার কালাম মাহমুদ এ চক্রের না হলেও যদি জানতে চান, নিরাপত্তার ইস্যু কেনো এতো বেশি আমার মাথায় ঢুকলো; তখন তো আর এক উটকো ঝামেলা হবে। সব মিলিয়ে শেখ রেহানার ইন্টারভিউ করার অ্যাসাইনমেন্ট আমি নিতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু মুখের উপর না বলার উপায় ছিলো না। তবুও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইগুই করলাম। কিন্তু খুব সুবিধা হলো না। বরং চাপ একটু বাড়লো। কালাম মাহমুদ বললেন, কেউ করে ফেলতে পারে, বেশি সময় নিও না কিন্তু! ব্যস, মেঘ না চাইতেই জল পাবার পরিবর্তে বরফ পাবার মতো দশা হলো! বরফে তেষ্টা মেটানোর চেষ্টা করলে অন্য রকম জটিলতা হবার আশংকা থাকে। মাই টিভিতে আমার এক সহকর্মী এ রকম পরিস্থিতি বুঝাতে বলে থাকেন, মেঘ না চাইতেই বজ্রপাত! আমার অবস্থাও হয়েছিলো অনেকটা এ রকম।

বুঝলাম, শেখ রেহানার সাক্ষাৎকার নেয়ার অ্যাসাইনমেন্ট এড়ানো যাবে না। খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললাম, তার বাসা কোথায়? আমার কথা শুনে কালাম মাহমুদ এতই বিরক্তিপূর্ণ অবাক হলেন যেনো আমি তার দাদার দাদা তার পরদাদার নাম জিজ্ঞেস করেছি! বললেন, আরে আমি কিভাবে জানবো! এ বলে তিনি একটি ফোন নম্বর দিয়ে বললেন, এটা শেখ রেহানার বাসার নাম্বার, ফোন করে জেনে নিও। এর পর বললেন, চা খাবে? এ প্রস্তাবের ইঙ্গিত হলো, অনেক হয়েছে; এবার ভাগো! তা না হলে লাঞ্চের সময় কেউ চা অফার করে! মেজাজ খুবই খিচিয়ে গেলো, কালাম মাহমুদের রুম ত্যাগ করলাম নিরবে।

সে সময় আর যাই হোক সিনিয়রদের সঙ্গে মেজাজ দেখাবার কালচার ছিল না। উল্টো সিনিয়ররা অনেক সময় খিস্তি করতেন; কখনো সামান্য কারণেও আসমান জমিন এক করে ফেলার মতো অবস্থা করতেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই, কিন্তু এতে উপকার ছাড়া ক্ষতি হবার রেকর্ড নেই। যেমনটি অতি কেয়ারিং বাবারা সন্তানদের সঙ্গে কখনো কখনো করে থাকেন। নাঈম ভাই’র (নাঈমুল ইসলাম খান) কাছে শুনেছি, অংক না পারার কারণে তার বাবা শীতের রাতে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। এবং সম্প্রতি তার অকপট স্বীকারোক্তি, এতে তিনি উপকৃত হয়েছেন। এ রকম কাছাকাছি অভিজ্ঞতা আমিসহ অনেকেরই আছে। তবে কথা হচ্ছে, এখন সে রকম বাবা খুঁজে পাওয়া কঠিন; আর এ ধরনের বিধান মেনে নেয়ার মানসিকতার সন্তান খুঁজে পাওয়াও প্রায় অসম্ভব। আর বাবার মতো মিডিয়া লিডার  তো এখন সোনার পাথর বাটি! এখনকার মিডিয়া লিডারদের বেশিভাগই জুট মিলের সিবিএ নেতাদের মানসিকতায় আক্রান্ত।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি নিশ্চিত হলাম, শেখ রেহানার বাসার ঠিকানা কালাম মাহমুদ জানতেন, না জানলেও যোগাড় করে দিতে পারতেন। চেষ্টা করতে পারতেন নিদেন পক্ষে। কিন্তু এর ধার দিয়েও গেলেন না। এতে বিরক্ত হলাম। তার ওপর আমার প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল। কিন্তু অনেক দিন পরে অনুভব করেছি, কালাম মাহমুদ সঠিক কাজটিই করেছেন। বেশি সাপোর্ট পেলে সন্তান যেমন বয়লার টাইপের হয়, রিপোর্টারদেরও তেমন লুথা হবার আশংকা থাকে। যে বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে মিডিয়ার মহামারি আকার ধারণ করেছে। পত্রিকার অনেক সাংবাদিক আছেন, যারা কপি পেস্ট-এর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন; আর টেলিভিশনের একদল সাংবাদিক আছেন যারা কেবল বাইট সংগ্রহ করেন, আগপিছ কিছুই জানে না, জানার চেষ্টাও করেন না। নানান সাপোর্ট এবং পেশামুখী নেতৃত্বহীনতা এ অবস্থার জন্য অনেকখানি দায়ী বলে বিচেনা করা হয়।

আজকের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝেছি, এ বিবেচনায়ই কালাম মাহমুদ আমাকে আংশিক সাপোর্ট দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। যাতে আমি নিজে বাকিটা করার মাধ্যমে অন্যরকম দক্ষতা অর্জন করি। বলে রাখা ভালো, দেড় বছর বয়সী একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার পক্ষ থেকে ১৯৮৭ সালে শেখ রেহানার সাক্ষাৎকার নেয়া খুব একটা সহজ কাজ ছিল না- এমনই বিবেচনা আমার ছিল তখন এবং এখনও। তবে অনিশ্চয়তা থাকলেও শেষতক ব্যর্থ হইনি। আর এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক হিসেবে আমার দক্ষতার পরিবর্তে ভাগ্য ও শেখ রেহানার অনুকম্পা বেশি কাজ করেছে বলে আমার ধারণা। আর পেশাগত জীবনে অন্যতম একটি দিক যোগ হয়েছে শিশুকালে টিউলিপকে কাছ থেকে দেখা।

‘কখনো রাজনীতি করবো না- শেখ রেহানা’ এ শিরোনামে শেখ রেহানার সাক্ষাৎকার ভিত্তিক আমার প্রচ্ছদ রিপোর্ট ছাপা হয়েছিলে ১৯৮৭ সালের ১৬ মার্চ সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ-এ। তখন পত্রিকাটির বয়স দেড় বছরের একটু  বেশি। সাক্ষাৎকারের জন্য আমি শেখ রেহানাকে  ফোন করি ১ মার্চ (১৯৮৭)। তিনি প্রথমে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। কিন্তু সাপ্তাহিক পত্রিকার অজানা সাংবাদিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি সামান্যতম অবজ্ঞা করেননি।  সে সময় আমার মুর্খ সাহস অথবা শেখ রেহানার নরম মানসিকতার কারণেই হোক, আমি তাকে নাছোড়বান্দার মতো অনুরোধ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। রিপোর্টারের কৌশল হিসেবে প্রকারন্তরে এও ধারণা দিলাম, তার সাক্ষাৎকার দেয়া না দেয়ার উপর আমার চাকরি থাকা-না থাকা অনেকখানি নির্ভর করে। সম্ভবত একজন অতি সাধারণ সাংবাদিকের ক্ষতি হবার আশংকা বিবেচনায় নিয়েই তিনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছিলেন। তবে স্পষ্ট শর্ত দিলেন, কোনো রা-জ-নৈ-তি-ক প্রশ্ন করা যাবে না। আমি তাতেই রাজি হলাম। শেখ রেহানার কাছ পর্যন্ত পৌঁছানো ছিল আমার জন্য কঠিন কাজ। এরপর লক্ষ্য কিভাবে হাসিল করতে হয় সে ট্রেনিং তখনও মোটামুটি আমার ছিল।

শেখ রেহানার মুখোমুখী হওয়ার পর্বটি সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকেই উদ্ধৃত করি, ‘পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুসারে তাঁর বাসায় যাই ৩ মার্চ সন্ধ্যা সাতটায়। দোতলায় উঠে দরজার বেল বাজাবার পর একজন এসে আমাদের পরিচয় জেনে  ভেতরে গেলো । এসময় চার পাঁচ বছরের একটি ফুটফুটে মেয়ে এসে দাঁড়ালো নেটঘেরা দরজার ওপারে। ক্যামেরা দেখে বললো, ও আপনারা ছবি তুলবেন তো। ক্যামেরাম্যান ছিলেন ফরিদ বাশার। শিশুটির আগ্রহ ফরিদের গলায় ঝুলানো ক্যামোর দিকে।

ফুটফুটে মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম, তোমার নাম কি?

: টিউলিপ।

: কি?

: টিউলিপ, টিউলিপ!

যে টিউলিপ ৮৭ সালে ক্যামেরা দেখে বলেছিলো, ‘ও! আপনারা ছবি তুলবেন।’ সেই টিউলিপ সিদ্দিক ২০১৫ সালে পরিণত হয়েছেন বিশ্ব ব্যক্তিত্বে। এখন শত ক্যামেরা তাকে অনুসরণ করে। যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে চমক দেখিয়ে প্রথমবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েই এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ৩২ বছর বয়সী টিউলিপ সিদ্দিক, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি, শেখ রেহানার মেয়ে। বিশ্ব মিডিয়ায় আলোচিত নাম টিউলিপ। এই হচ্ছেন আজকের টিউলিপ সিদ্দিক। এর মধ্যে তার খালা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করছেন তৃতীয় মেয়াদে। মাঝখানে স্বল্প মেয়াদে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানও ছিলেন। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনী, শেখ রেহানার মেয়ে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনী- এ ধারাহিকতায় কতভাবেই টিউলিপকে চিনতে পারতো দেশের মানুষ। যেমনটি হয় আমাদের দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানদের ক্ষেত্রে। কিন্তু হতাশার এ ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে টিউলিপ সিদ্দিক এখন বিশ্বনন্দিত নাম। এ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত আমাদের দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক পরিবারগুলোর।

                  

               লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, মাই টিভি

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment