অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-১৬

চিরকাল থাকার বাসনা থাকলেও বছরখানেকের বেশি এরশাদ মজুমদাদের সাপ্তাহিক রিপোর্টারে আমার থাকা হয়নি। এর অর্থ এই নয় যে, আমি ছেড়ে দিয়েছি অথবা আমাকে ছাড়িয়ে দিয়েছে; আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে পত্রিকাটিই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সেটি আর চালু হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ হচ্ছে পেশাদার সাংবাদিকের মালিকানায় পত্রিকার পরিণতি। কেবল পত্রিকা বলে কথা নয়, প্রচলিত সরল পথে হেটে কোন প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা প্রায় ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। অনেক সময় ঝলমলে সাফল্যের পিছনে থাকে কুৎসিত ক্লেদ।

সাপ্তাহিক রিপোর্টার হঠাৎ বন্ধ হলেও আমাকে বেকার হতে হয়নি। অবশ্য এখন পর্যন্ত তিন দিনের বেশি একটানা বেকার থাকার রেকর্ড নেই, ছোটখাটো যাই হোক, মিডিয়ার পেশায়ই থেকেছি; এখনো আছি। প্রায় অনায়াসেই একটি কাজ পেয়েই গেছি কোথাও না কোথাও। আর সেটিকেই ধ্যানজ্ঞান বিবেচনা করে কাজ করেছি। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষকের মতো কাজ করলেই যে কেবল হয় না- তা বুঝলেও অন্যকিছু করার প্রবণতার বাইরে আছি শুরু থেকেই। আর মজ্জাগত ত্রুটির কারণে চাকুরি টিকিয়ে রাখার আকাবাক অলিগলি হেটে উপরে ওঠার প্রচেষ্টায় মনোনিবেশ করার প্রবণতা আমার কখনোই ছিলো না। শুরু থেকে মনে করে আসছি, যা হবে তা যোগ্যতার ভিত্তিতেই হবে। কিন্তু আমার এ মনে করা যে চলমান ঘটনাপ্রবাহের আলোকে সব সময় বাস্তবসম্মত নয় তাও হাড়েহাড়ে টের পেয়েছি বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু এর পরও অন্য পথে হাটতে রুচিতে বাঁধে। এটি আসলে এক ধরনের অযোগ্যতা। আরো কিছু অযোগ্যতার সঙ্গে এ প্রবণতার ঘাটতিই হচ্ছে পেশাগত রেসে নিদারুণভাবে পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ। সব মিলিয়ে শেষতক অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, মিডিয়ার প্রায় সবখানেই নিয়ন্ত্রণ রেখার নেতৃত্বে আসিন এক সময়ে আমার জুনিয়র, অনুকম্পা প্রাপ্তরা অথবা তাদের মুরব্বিরা। এরা আমাকে সম্মান করেন, ভালোও বাসেন। কিন্তু পাশে উপরে বা নীচে বসাবানোর অব্যক্ত আবেদন নীরবে এড়িয়ে যান। আমি এখন তাদের বিবেচনায় জুনিয়র বড় ভাই! আর এদের বলয় ভেদ করার দানবীয় প্রবণতাও নেই আমার। ফলে চাকুরী পাবার সুযোগ কমতে কমতে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। ফলে বর্তমান চাকুরি হারালে অথবা ছাড়তে বাধ্য হলে আমাকে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতায়ই স্থায়ী হতে হবে। যার সূচনা করেছি প্রায় বছর তিনেক আগে।


শুরুর পত্রিকা সাপ্তাহিক জনকথায় থাকালে পরিচয় হওয়া ডিএফপির আবদুর রশিদ খলিফার মাধ্যমে এ সংস্থার পরিচালক কালাম মাহমুদের সঙ্গে সাধারণ পরিচয় হয়েছিলো। প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সরকারে এ কর্মকর্তা আমাকে বেশ পছন্দ করতেন, হয়তো তিনি তার সহকর্মী রশিদ খলিফার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। পরে জেনেছি সাপ্তাহিক রিপোর্টারে প্রকাশিত একাধিক রাজনৈতিক রিপোর্ট দেখেছেন কালাম মাহমুদ। এর বাইরেও আমার বিষয়ে তিনি বেশি আগ্রহী হয়েছিলেন জাওয়াদুল করিম সম্পাদিত সাপ্তাহিক ছুটিতে প্রকাশিত গল্প পড়ে। শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর জাওয়াদুল করিম প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি হয়েছিলেন। এর পর পত্রিকাটির হয়তো অপমৃত্যু হয়েছে।


একই সময়ে মেধহীন রাজনৈতিক রিপোর্ট ও আবেগে টইটুম্বুর প্রেমের গল্প পড়ে কালাম মহমুদের ধারনা হয়েছিলো, পাঠক আকৃষ্ট করার মতো যেকোন বিষয়ে রিপোর্ট করার অসাধারণ ক্ষমতা অছে আমার। অরো অনেক পরে তিনি একদিন বলেছিলেন, কিশোর বয়সে তার প্রেমের ঘটনাই আমি গল্প হিসেবে লিখেছি। কিন্তু কে কাকে বুঝায়, আসলে গল্পের প্লটটি আমারই ব্যর্থ প্রেমের উপাক্ষাণ। তাছাড়া তার কিশোর বয়সে আমার জন্ম হয়েছে কিনা সন্দেহ; তো তার প্রেমের কাহিনী আমি জানবো কিভাবে! অসলে সকল প্রেমের কাঠামোই অভিন্ন; প্রকাশ ও প্রেক্ষিতে কেবল পার্থক্য। যে কারণে হতদরিদ্র নিতাই শীলের প্রেমের সঙ্গে স¤্রাট আকবরের প্রেমের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন কোন কাজ নয়! আমার নিজের প্রেম বাসনার সঙ্গে এ কারণেই সম্ভবত কালাম মাহমুদের প্রেমের চিত্র এক ফ্রেমের মনে হয়েছিলো। অথবা তিনি যা বলেছেন সেটিও ছিলো এক গল্প। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক জনতা, সাপ্তাহিক পূর্বানী, সাপ্তাহিক মেঘনা, সাপ্তাহিক লাবনীসহ বিভিন্ন পত্রিকায় আমার লেখা গল্পও তিনি পড়েছেন। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি গল্প পড়ার বাতিকে আক্রান্ত ছিলেন; আসলে নবীনদের গল্প পড়ে একটি ছায়া টীমের ছক তৈরী করতেন কালাম মাহমুদ। এ ছকে পড়েই সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে আমার সুযোগ লাভ। গল্প লিখে কলেজের আশাতো প্রেমিকার নজর কাড়া সম্ভব না হলেও এ গল্পই চাকুরি পাবার ক্ষেত্রে বড় রকমের একটি ভূমিকা রেখেছে আমার অজান্তে।


সাপ্তাহিক রিপোর্টার যখন বন্ধ হয় তখন কালাম মাহমুদ ছিলেন ডিএফপি’র মহাপরিচালক। এর আগে এ সংস্থার পরিচালক থাকাকালেই তিনি সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ-এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রটনা আছে, এরশাদ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেন, আর সেনা প্রধান জেনারেল আতিক ছিলেন তার খুবই ঘনিষ্ঠ। কানে কিঞ্চিত খাটো এ জেনারেল দেশের পরবর্তী কান্ডারী হবেন- এমন ধারণা ছিলো বিভিন্ন মহলে। এসব মহলে কালাম মাহমুদের বেশ কদর ছিলো। কিন্তু জেনারেলর আতিক সেনা প্রধান হিসেবে সিভিল প্রশাসনের সর্বোচ্চ কেন্দ্র সচিবালয় ভিজিট করার বালখিল্য আচরণ করলেও মসনদে আসিন হবার সুযোগ আর পননি। চাকুরির শেষ দিন পর্যন্ত এরশাদের প্রতি দৃশ্যত অনুগত থেকেই বিদায় নিয়েছেন। এদিকে অবসর নেয়ার পর কালাম মাহমুদ প্রকাশ্যে জড়িত হন দৈনিক যুগান্তরের সঙ্গে, এখানেই ছিলেন আমৃত্যু। সরকারী চাকুরীতে থেকেও সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রবণতা থেকেই তিনি সাপ্তাহিক সন্দ্বীপের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে আইডিয়া দিতেন, তার ব্রিফ অনুসারে পত্রিকাটির প্রচ্ছদ তৈরি করতেন ডিএফপির আর এক কর্মকর্তা মুনির; পুরো নাম মনে নেই। সব মিলিয়ে পত্রিকাটির ওপর কালাম মাহমুদের বেশ প্রভাব ছিলো, যা পরে নিজেও অনুভব করেছি।


কালাম মাহমুদ আমার বিষয়ে সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ-এর মালিক ও সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানকে ফোন করলেন দুপুরের দিকে। সন্ধ্যায় আমি সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে যোগ দেই স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে, বেতন নির্ধারিত হলো তিন হাজার টাকা; আগের চেয়ে দ্বিগুনেরও বেশি। অফিস ফকিরের পুলেই, সাপ্তাহিক রিপোর্টার-এর উল্টো দিকে. ১৮/এ/৩ টয়েনবি সার্কুলার রোড। আমার নতুর কর্মস্থল আগের চেয়ে বেশ গুছানো, বেশ ছিমছাম।


কাগজপত্রে পত্রিকার সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমার, তবে তিনি ছিলেন মূলত ব্যাংকার। সরকারি ব্যাংকের চাকুরী ছেড়ে গড়ে তোলেন বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, বিসিআই; দায়িত্ব নেন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানটি শেষতক টেকেনি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সে বিধি বহির্ভূতভাবে সিডিউল ব্যাংকিং করার অভিযোগে এটি বিএনপি সরকারের সময় বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে এটি করা হয়েছে যতনা আইন লংঘনের কারণে তার চেয়ে বেশি করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যাতনায়; প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে হাজার হাজার লোকর জীবন কেবল অনিশ্চিত করা নয়, জেলেও পোড়া হয়েছিলো মোস্তাফিজুর রহমানকে। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন, সন্দ্বীপ তথা চট্টগ্রাম-৩ আসন থেকে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন একই আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য তার ছেলে মাহফুজুর রহমান মিতা।

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি হিসেবে মুস্তাফিজুর রহমান ও সম্পাদক হিসেবে তার স্ত্রীর নাম ছাপা হতো, মোহেসেন আরা। তবে সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ-এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন পেশাদার সিনিয়র সাংবাদিকরা। সে সময়ে ক্রেজ সাপ্তাহিক বিচিত্রাকে মডেল হিসেবে ধরে নিয়েই একই কাঠামোতে সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ প্রকাশ করা হয়েছিলো। নিজের এলাকার নামে পত্রিকার নাম দিয়েছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। কিন্তু সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ আর বিচিত্রা হতে পারেনি। এ পত্রিকাটি দ্রুত বিচিত্রার কাছাকাছি গিয়ে অতিদ্রুত নেমে গিয়েছিলো। এ জন্য অনেকেই মালিকের খামখেয়ালিকে দায়ী করে থাকেন। বিশেষ করে কার্যকরী সম্পাদকদের সঙ্গে তার অবাঞ্চিত আচরণ। তাদের সঙ্গে প্রায়ই মোস্তাফিজুর রহমানের তীব্র মতদ্বৈততা সৃষ্টি হতো, কারো উপর বিরক্ত হলে তিনি আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করতেন এবং তুচ্ছ-তাছিল্য করে কথা বলতেন প্রকাশ্যে। ফলে কার্যকরী সম্পাদকদের চাকুরি ছাড়ার ঘটনা ঘটতো অহরহ। একই কারণে আমি নিজে ছাড়া পর্যন্ত দেড় বছরে কার্যকরী সম্পাদক হিসেবে পেয়েছি চার জনকে। তারা হচ্ছেন অনোয়ারুল হক, নাজিমউদ্দিন মানিক, মাহফুজউল্লাহ ও বেলাল চৌধুরী। ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে শুরু থেকে পেয়েছি পারভেজ আলম চৌধুরী, মাহমুদ শামসুল হক, নূরুল হাসান খান, আফরোজা নাজনীন ও শাহাদত হোসেনকে। নিয়মিত কন্ট্রিবিউট করতেন আলী মাহমুদ, এলাহী নেওয়াজ খান, ডেইলী অবজাভার-এর বিশ্ববিদ্যায়ল রিপোর্টার সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাসহ বেশ কয়েকজন। কলাম লিখতেন সন্তোষ গুপ্তসহ সিনিয়র সাংবাদিকরা। নিয়মিত কলাম লেখকদের মধ্যে আরো ছিলেন সে সময় দৈনিক বাংলারবাণীতে প্রায় বিনা বেতনে চাকুরি করা রাজনৈতিক বিবেচনায় সাংবাদিক, আজকের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি লিখতেন ‘বিদেশ’ নামে আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে একটি কলাম। এর বাইরে কার্যকরি সম্পাদকরাও কলাম লিখতেন। আনোয়ারুল হকের কলামের নাম ছিলো, পোস্টার; ‘মাহফুজউল্লাহর কলাম’ নামে লিখতেন মাহফুজউল্লাহ।


পত্রিকা হিসেবে সাপ্তাহিক রিপোর্টার ও সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ-এর কাঠামোতে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও প্রথম দিন থেকেই আমার ওপর চাপের মাত্রা ছিলো এক লেবেলেই। সাপ্তাহিক রিপোর্টার-এর প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট ছিলো জগন্নাথ হল ধসে পড়ার ঘটনার ফলোআপ রিপোর্ট করা। এরশাদ মজুমদারের সম্পাদনায়র পত্রিকায় সে সময়ের বাস্তবতায় এ রিপোর্ট করা আমার জন্য খুব সহজ কাজ ছিলো না। কিন্তু সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে এর চেয়েও কঠিক কাজ চাপানো হলো আমার উপর প্রথম দিনই। দেয়া হলো শেখ রেহানার বিশেষ সাক্ষাৎকার নেয়ার এ্যাসাইনমেন্ট। এবং শীতল কণ্ঠে কালাম মাহমুদ বললেন, এটি প্রচ্ছদ রিপোর্ট হবে, সে হিসেবে করবে! ব্যাস, দ্বিগুন বেতনের চাকুরি পাবার উচ্ছাস চাঙ্গে ওঠার মতো অবস্থা হলো আমার!!
ছবি: ১৯৮৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক রিপোর্টারে প্রকাশিত প্রচ্ছদ রিপোর্ট এবং ৮৬ সালের ৫ ডিসেম্বর সাপ্তাহিক ছুটিতে প্রকাশিত গল্প

ছবি: ১৯৮৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক রিপোর্টারে প্রকাশিত প্রচ্ছদ রিপোর্ট এবং ৮৬ সালের ৫ ডিসেম্বর সাপ্তাহিক ছুটিতে প্রকাশিত গল্প।

লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, মাই টিভি

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment