অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-১৮

আমরা শেখ রেহানার ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে টিউলিপের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই এলো তার বড় ভাই ববি। টিউলিপের চেয়ে বছর দুয়েকের বড় হবে। ববি নেটের দরজা খুলে দিলো। এর মধ্যে শেখ রেহানা চলে এলেন। প্রথমারের মতো বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যার মুখোমুখি হলাম। এর আগে-পরে পেশাগত কারণে বঙ্গবন্ধুর বড় কন্যার মুখোমুখি হয়েছি একাধিকবার।

শেখ রেহানা মুখোমুখি প্রথমবার হলাম ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন বসার ঘরে, মাঝারি সাইজের বসার ঘর, কিন্তু বেশ গুছানো। একটু বসুন আসছি- বলে বসার ঘর থেকে বের হতে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ালেন শেখ রেহানা। বললেন, কোনো রা-জ-নৈ-তি-ক কথা কিন্তু হবে না! আমি সুবোধ বালকের মতো মাথা নাড়লাম। বললাম ঠিক আছে, কোনো রাজনৈতিক কথা হবে না। আমার উদ্দেশ্য ছিল, যেকোনোভাবে লক্ষ্যে পর্যন্ত পৌঁছানো। মুক্তা আহরণ করতে হলে আগেতো সমুদ্রে নামা নিশ্চিত করতে হয়! আর আমিতো সমুদ্রের তীর পর্যন্ত পৌঁছেছি। এ অবস্থায় খুবই সাবধান ছিলাম যাতে খালি হাতে ফিরতে না হয়।

অবশ্য, এ পর্যন্ত কেবল একবার বিফল হয়ে ফেরার দৃষ্টান্ত আছে। তখন আমি সাপ্তাহিক সুগন্ধায়। সন্তোষ শর্মা ও আমি জেনারেল নূরউদ্দিনের ইন্টারভিউ করতে গিয়েছিলাম তার ডিওএইচএস-এর বাসায়। এরশাদ শাসনের সর্বশেষ সেনাপ্রধান এ জেনারেল রাজনীতিতে নেমেছেন। রাজনীতিতে আসার কারণ সম্পর্কে জনসেবাকেন্দ্রিক এন্তার বিবরণ দিলেন তিনি। আমি সাবসিডিয়ারি প্রশ্ন করলাম, আপনার রাজনীতিতে আসার উদ্দেশ্য কি জনসেবা নাকি জেনারেল এরশাদের বিশ্বাস ভঙ্গজনিত রোষানল থেকে বাঁচার প্রটেকশন? আমার প্রশ্নে নব্য রাজনীতিক খুবই চটে গেলেন। ‘ওভার স্মার্ট’ বলে মিলিটারি স্টাইলে আমাকে গালি দিলেন। এরপর চলে গেলেন বাসার ভেতরে। আমরা দুজন ফিরে এলাম বিফল হয়ে। তিনি একবার রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। এবং হুইল চেয়ারে বঙ্গভবনে গিয়ে  হাসিনা সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন অদ্ভূত এক ইকোয়েশনে।

এ ঘটনার অনেক আগে শেখ রেহানার সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে অনেক সাবধান ছিলাম। রাজনৈতিক কথা না বলার শর্ত থাকলেও ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ শেখ রেহানার সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে অনেক কথা হয়। সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে উদ্ধৃত করা যায়, ‘প্রথমে বুঝতেই পারিনি, কি কারণে তিনি বারবার রাজনৈতিক প্রসংগ না তুলবার জন্য বলছেন। যার ধমনীতে একজন বিরাট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রক্ত প্রবাহিত, জন্মের পর থেকে বেড়ে উঠেছেন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে। ফলে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাবার বোধগম্য কারণ প্রথমে আমার বোধগম্য হয়নি। ফলে তার অই বক্তব্যকে যৌক্তিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানো ছিলো কঠিন। মনে হয়েছে অসংলগ্ন। কিন্তু এর কারণ আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর্যায়ে। তখন মনে হয়েছে কারণটি না বুঝলেই ভালো হতো। কেননা, মানুষের মনের গভীরে যে বেদনা থাকে তা সহজেই সংক্রমিত হয়।’

শর্ত ছিল রাজনৈতিক প্রশ্ন করা যাবে না, কিন্তু আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। কিন্তু সরাসরি এ প্রসঙ্গে যাবার উপায় ছিল না। তাই শুরু করলাম একেবারে ছেলেবেলা প্রসঙ্গ দিয়ে। এতে দুটো কাজ হলো। এক. তার জীবনের কিছু সাধারণ ঘটনাও পাঠকের কাছে অসাধারণ হিসেবে বিবেচিত হবে। দুই. ছেলেবেলার স্মৃতি বলতে শুরু করলে মানুষ অনেক কথাই বলে অতি সহজে, যা ফরমাল প্রশ্নে বলতে চায় না।

সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে উদ্ধৃত করি, ‘দাদুর প্রসঙ্গ বলতে বলা হলে চলে আসে শেখ রেহানার ছেলেবেলার কথা। তিনি বললেন, আজ দাদুর অনেক স্মৃতিই তো মনে পড়ে। কোনটা বলি। মনে আছে দাদুর সাথে গ্রামের হাটে যেতাম। সে কি আনন্দ! তার সাথে নৌকায় চড়ে শিকাড়ে যাওয়াও অনেক আনন্দের ছিলো। দাদু প্রায়ই লেখাপড়া নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন। নামতা ধরতেন। মুখেমুখে কঠিন অংক করতে বলতেন। তখন সত্যিই বেকায়দায় পড়তাম। হঠাৎ হয়তো তিনি বলে বসতেন, আমাকে অমুক ছুরাটা একবার শোনাও তো। ………দাদীর কথা বেশী করে মনে পড়ে। গ্রামের বাড়ীতে গেলে তিনি সারাক্ষণ শুধু খাওয়াতে চাইতেন। এখান থেকে এটা, ওখান থেকে ওটা বের করতেন। যেনো তার কাজই ছিলো কত বেশী খাওয়ানো, আর দুধ খাওয়ানোর উপর জোর ছিলো একটু বেশী। কিন্তু আমি খেতে চাইতাম না। প্রায়ই তিনি দুধের বাটি নিয়ে পিছনে পিছনে ছুটতেন। এমন আদর এখন আর পাই না। তিনি বিভিন্ন উপদেশ দিতেন। বলতেন, কারো সাথে উচ্চকণ্ঠে কথা বলবে না; কেউ মন্দ বললে চুপ করে থাকবা। লক্ষ্য করলাম, দাদা-দাদীর স্মৃতিচারণকালে শেখ রেহানার কণ্ঠে এক ধরণের আবেগ কেঁপে কেঁপে উঠছে। এতে অনেকখানি জুড়ে ছিলো অপার আনন্দ, বাকিটা জুড়ে ছিলো বেদনা। উল্লেখ্য, তার দাদী ৭৪ সালের ৩১ মে এবং দাদা ৭৫ সালের ৩০ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।’

আমার মাথার মধ্যে ছিল প্রচ্ছদ রিপোর্ট করার বিষয়টি। দাদা-দাদির প্রসঙ্গে স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে অল্প সময়ের মধ্যেই শেখ রেহানা আমাদেরকে বেশ আস্থায় নিলেন; পত্রিকার অচেনা লোকের দেয়াল ভেঙে তিনি আমাদের পরিচিতজনের মতোই গ্রহণ করলেন। এরপরও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ তোলার ভরসা পাচ্ছিলাম না। ঝুঁকি কমিয়ে রাখার জন্য ব্যক্তিগত স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে আরো কিছুক্ষণ থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। এদিকে, ফরিদ বাশার ইশারায় তাগাদা দিচ্ছিলেন, দ্রুত শেষ করার জন্য। বেশির ভাগ ক্যামেরাম্যানের যা স্বভাব, কেবল তাড়াহুড়া। কিন্তু আমি তখনও আসল কাজই শুরুই করতে পারিনি, এদিকে সময়ও কম। এ অবস্থায় মূল লক্ষ্যে দ্রুত যাবার জন্য মায়ের সঙ্গে স্মৃতি প্রসঙ্গ তুললাম।

সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে উদ্ধৃত করি, ‘মা’র স্মৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করার সাথে সাথে শেখ রেহানার চোখে শোকের প্রগাঢ় ছায়া নেমে আসে। ছলছল হয়ে ওঠে দু’চোখ। দু’তিন মিনিট কোন কথা বলতে পারেননি। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলেন, মা যেনো সারা জীবন দুঃখ ভোগ করতেই পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন ধীরস্থির ও খুব শান্ত প্রকৃতির। তার মতো আর কাউকে দেখি না। ছোট্ট বেলায় মা-বাবা হারিয়ে মা স্বাভাবিক কারণেই দুঃখ-কষ্টের মধ্যে মানুষ হয়েছেন। বুদ্ধি হবার পর দেখিছি স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বেশীর ভাগ সময় বাবা ছিলেন জেলে। মাকেই সবকিছু সামলাতে হয়েছে। সংসার, আমাদের লেখাপড়া থেকে দল ঠিক রাখা পর্যন্ত সবকিছুই মাকে করতে হয়েছে। কিন্তু কখনো তাকে অধৈর্য হতে দিখিনি। তখন পলিটিকসের কিছুই বুঝি না। হাসিনা আপাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে পাকিস্তান আমলে কর্তৃপক্ষ রাজী ছিলো না। ওদিকে বড় ভাইকে (শেখ কামাল) ঢাকা কলেজে ভর্তি হতে দেয়া হচ্ছিলো না। এ ব্যাপারে নাকি গভর্নর মোনায়েম খানের কড়া নিষেধ ছিলো। এ ঝামেলা মাকেই মোকাবিলা করতে হয়েছে।’

এরপর নিজে থেকেই রাজনৈতিক বিষয়ে এলেন শেখ রেহানা। সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে উদ্ধৃত করি, ‘মা কখনোই আব্বার রাজনীতি করা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। মা না চাইলে বাবার পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব হতো কিনা সে ব্যাপরে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। শত ঝামেলা এবং দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও মা সবসময় রাজনীতিতে বাবাকে অনুপ্রেরণাই দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ে মা’র ইতিবাচক সমর্থন ছিলো। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় অনেকেই বাবাকে প্যারলে মুক্তি নিয়ে আইয়ুব খানের গোল টেবিল বৈঠকে যাবার জন্য কলেছিলেন। কিন্তু মা বিরোধিতা করেছেন প্রচণ্ডভাবে। মাকে আব্বার কাছাকাছি যেতে দেয়া হয়নি। মা চিৎকার করে আব্বাকে বলেছিলেন, তুমি প্যারলে যাবে না; গেলে বাঙ্গালীদের সাথে বেঈমানী করা হবে। মা’র সম্পর্কে কেউ জানে না, লেখে না। লিখলে অনেক অকথিত কথা মানুষ জানতে পারতো।’

দাদা-দাদির স্মৃতিচারণ বাদে সাক্ষাৎকারের বাকি সময় শেখ রেহানার পুরোটাই জুড়ে ছিল বেদনার প্রকাশ। সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে উদ্ধৃত করি, ‘কথায় কথায় শেখ রেহানার চোখ আবারও ছলছল করে উঠলো। বড় ফোটার অশ্রু ঝড়ে পড়ে। এতক্ষণ কথা বলার সময় অবুজ মেয়ে টিউলিপ বেশ কয়েক বার এসেছে এটাওটা জিজ্ঞেস করতে। শেখ রেহানা একটু আদর করে ভিতরে গিয়ে খেলতে বলেছেন মেয়েকে। কিন্তু এবার তিনি ওকে কোলে টেনে নিলেন। অবুঝ শিশুকে অলম্বন হিসেবে আকড়ে ধরে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, মা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন। মা প্রায়ই বলতেন, আমার কিছু ভালো লাগে না; কি যেনো একটা ঘটবে। হয়তো এ জন্যই তিনি আমাকে বিদেশে যেতে দিয়েছিলেন। তাই আমাকে আজ এই দুর্বিসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। শেখ রেহানা আবার মায়ের কথায় ফিরে এলেন, প্রকৃতপক্ষে পুরো সংসারের বোঝা ছিলো মা’র উপর। আমাদের শাসন করার দায়িত্বও ছিল তার উপর। কিন্তু তবুও তিনি ছিলেন বন্ধুর মতো। খাবার সময় কতদিন গল্প শুনতে শুনতে হাতের ভাত শুকিয়ে যেতো।’

মার স্মৃতিচারণ করতে করতে শেখ রেহানা এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন যে, তাকে আর প্রশ্ন করা সম্ভব হচ্ছিলো না। শোভনও ছিল না। তাই পরিস্থিতি কিছুটা হালকা করার জন্য সন্দ্বীপ চিত্রগ্রাহক ফরিদ বাশার স্বামী-সন্তানসহ শেখ রেহানার কয়েকটি ছবি তোলেন।

একটু পরে নিজে থেকেই শেখ রেহানা স্মৃতিচারণ করেন। সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে উদ্ধৃত করি, ‘রাসেল ছিলো সবার ছোট এবং সবার আদরের। বাকী আমাদের চার ভাই-বোনের দুটি দল ছিলো। এক দলে হাসিনা আপা আর জামাল ভাই; অন্য দলে আমি আর কামাল ভাই। মেঝ ভাইয়ের (শেখ জামাল) সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিলো বেশী, ঝগড়াও হতো বেশী। আমরা ভাই-বোনরা প্রায়ই আড্ডা জমাতাম। কিন্তু কামাল ভাই এসব এড়িয়ে চলতে চাইতেন। আব্বা জেলে থাকার সময় সংসারের কাজকর্ম তাকেই করতে হতো। এর ফলে তার মধ্যে এক ধরনের দায়িত্ববোধ এবং কিছুটা গাম্ভীর্য এসেছিলো। কিন্তু আমরা মানতে চাইতাম না। কামাল ভাই ছিলো সাদাসিদা প্রকৃতির। কিন্তু জামাল ভাই ছিলো স্টাইলিস্ট। আমাদের সব ব্যাপারেই কামাল ভাইর একটা নিয়ন্ত্রণ ছিলো। আমরা ভাইবোনেরা একটা দল গড়তে চেয়েছিলাম। হাসিনা আপা ভাল বেহালা বাজতেন, জামাল ভাই গিটার, কামাল ভাই বাজাতেন সেতার আর আমি গান শিখতাম। কামাল ভাই নাটকও করতেন।’

সাপ্তাহিক সন্দ্বীপের সাথে সাক্ষাৎকারে ভাবিদের ব্যাপারেও স্মৃতিচারণ করেছিলেন শেখ রেহানা, ‘ভাবীদের মধ্যে জামাল ভাইর বৌ রোজী তো ছিলো আমার ফুপাতো বোন, আমার বয়সী। ছোটবেলা থেকেই বন্ধুত্ব ছিলো আমাদের। কামাল ভাইর বৌ খুকী ভাবীকে তো আগে থেকেই খুকী আপা ডাকতাম। বিয়ের পরও ডাকতাম। কিন্তু কামাল ভাই চাইতেন না আমি আপা ডাকি; তিনি চাইতেন ভাবী ডাকি। আমি বলতাম, হঠাৎ করে ভাবী ডাকা যাবে না, সময় লাগবে। কিন্তু সেই সময়তো আর পেলাম না।’

শেখ রেহানা আলাদা করে বললেন শেখ রাসেলের বিষয়ে, ‘ওর কত আর বয়স ছিলো, দশ হবে। খোদা কেনো যে ওকে পাঠিয়ে ছিলো এই দুনিয়ায়। ওর জম্মের সময় বাবা ছিলেন জেলে। অতটুকু শিশুও ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। রাসেল সব সময় খেলা নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। ওর দাবী-দাওয়া ছিলো আব্বার কাছে। আব্বাও ওকে কাছে কাছে রাখতে চাইতেন। মাঝে মধ্যে ওর সাথে আমার বাজতো। আমি বলতাম আমি ছোট, ও বলতো, তুমি আগে ছোট ছিলা এখন আমি ছোট। আমাদের সঙ্গে ওরও যাবার কথা ছিলো। কিন্তু মা ওকে ছেড়ে থাকতে পারবেন না বলে রাসেলকে যেতে দেয়া হয়নি।’

এরপর এলো বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ। সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে উদ্ধৃত করি, ‘বাবার স্মৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে শেখ রেহানা ফাঁকা দৃষ্টিমেলে বহুদূরের কাউকে বলার মতো কণ্ঠে বললেন সেই স্মৃতি কি বলে শেষ করা যায়! বাবা সবাইকে ভালবাসতেন। আমি ছিলাম তার খুব কাছের। প্রতি জন্মদিনে তাকে প্রথম ফুলটা আমিই দিতাম। তিনি নিয়মিত মর্নিং ওয়ার্ক করতেন। আমি তার সাথে অত জোরে জোরে হেটে পারতাম না। কিন্তু গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বাড়ির কাছাকাছি আসলে আমি দৌড়ে তার কাছে চলে যেতাম। আমাদের বাসায় বেলী ফুলের গাছ ছিলো। আমি মালা গেঁথে আব্বাকে দিতাম। কখনো কখনো বাবার উপর বিভিন্ন কারণে রাগও করেছি। হয়তো কোথাও যেতে চেয়েছি, তিনি যেতে দেননি। ফলে রাগ করে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। বাবা নিজে আদর করে না সাধা পর্যন্ত খাইনি। অবশ্য রাত করে ফেরাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারতাম না। রেগে গিয়ে বলতাম, পলিটিকস করেন কেন? বাবা বলতেন, তুই এমন কথা বলিশ কেন, আমার কাছে তুইও যা সাড়ে সাত কোটি মানুষও তা। এতে আমার রাগ আরো বেড়ে যেতো। বলতাম, আমি কারো সাথে ভাগাভাগি করে নিতে পারব না। আজ বুঝি, বাবা আমার থেকে অই ধরনের বক্তব্য আশা করেননি।’

এখানে এসে শেখ রেহানা আবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। ধরা গলায় বললেন, ‘আমার এখনো বিশ্বাস হয় না আব্বা নেই। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আব্বা প্রথমে অমাকে বিদেশ যেতে দিতে চাননি। বলেছেন, তুই গিয়ে থাকতে পারবি না, কষ্ট হবে। তখন কেন যে আব্বার কথা শুনলাম না। কপালে দুঃখ ছিলো। তা না হলে এক সাথেই যেতে পারতাম। আমরা দু’বোন বেঁচে থেকে বুঝতে পারছি এভাবে বেঁচে থাকার কি অসহনীয় যন্ত্রণা।’

কিছুক্ষণ পর নিজকে সামলে নিয়ে শেখ রেহানা ধীরে ধীরে বলতে থাকলেন, ‘বাবা জেলে থাকতে  প্রতি সপ্তাহে আমি চিঠি লিখতাম। সংসার, রাজনীতির সবকিছুর খবরই আমি তাকে দিতাম। সে সময় পত্রিকার রাজনৈতিক খবরের কাটিং রাখতাম। কোন সপ্তাহে চিঠি লিখতে না পারলে আব্বা চিঠির প্রথম লাইনটি থাকতো, মা তুই কি অসুস্থ, চিঠি লিখলি না কেন?’

জাতির পিতা সম্পর্কে সাপ্তাহিক সন্দ্বীপের সঙ্গে শেখ রেহানা আরও বলেছিলেন, ‘আব্বা মানুষকে খুব বিশ্বাস করতেন। পিতা হিসেবে খুবই স্নেœহশীল ছিলেন। তিনি চাইতেন, আমরা সারাক্ষণ তার পাশেপাশে থাকি। ঝড়-তুফান হলে সারা রাত তিনি ঘুমাতেন না। তসবী নিয়ে সারারাত ছুটাছুটি করতেন। আর বলতেন, আল্লাহ আমার দেশ গরীব, তুমি রহমত কর। আমরা তাকে ঘুমাতে বললে বলতেন, তোরা বুঝিস না, আজ কেউ বাঁচবে না। সবার জন্য তার অফুরান ভালোবাসা ছিলো। আব্বা বাইরে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু ঘরে এসে আমাদের সাথে খেলার সময় শিশুর মতো হয়ে যেতেন। মাঝে মধ্যে ছাদে বসে আব্বার মাথার পাকা চুল বেছে দিতাম। শেষ দিকে পাকা চুল বাছার সময় একদিন কি কারণেই যেনো মাথার একটি কাটা দাগ দেখিয়ে বললেন, আমার লাশ তো তোরা পাবি না, পেলেও চিনতে পারবি না; এই কাটা দাগ দেখে যদি চিনতে পারিস। তাঁর অই কথা শুনে বুকের ভিতর ধক করে উঠেছিলো। অই ধরনের কথা শুনতে আমার মোটেই ভালো লাগেনি। তাই ও নিয়ে আব্বাকে কোন দিন কোন প্রশ্ন করিনি। কেবল বলতাম, এই ধরনের কথা বলবেন না। কিন্তু তার কথাই এইভাবে সত্যি হয়ে গেলো।’

বাবার সঙ্গে শেষ কথা প্রসঙ্গে শেষ কথা প্রসঙ্গে শেখ রেহানা সাপ্তাহিত সন্দ্বীপের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আব্বা চাননি আমি বিদেশ যাই। তিনি বলেছিলেন, বাইরে তোর ভালো লাগবে না, কান্নাকাটি করবি; যেয়ে কাজ নেই। তার কথা শুনিনি। কিন্তু বিদেশ গিয়ে দেখলাম আব্বার কথাই হুবহু সত্যি। একটুও ভালো লাগছে না। কিন্তু এ কথা লজ্জায় তাকে বলার উপায় ছিলো না। তবু কয়েকদিন পর ১৩ আগস্ট টেলিফোনে আব্বাকে বললাম, আমি দেশে অসতে চাই, আমার একদম ভালো লাগছে না। আমার কথা শুনে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, কিরে আগে বলিনি, ঠিক আছে আমি টিকেট পাঠাবার ব্যবস্থা করছি, মন খারাপ করিস না। এই তার সাথে শেষ কথা।’

শেখ রেহানা ১৯৭৫ সালের ৩১ জুলাই বড় বোন শেখ হাসিনা ও ভগ্নিপতি ড. ওয়াজেদের সাথে জার্মানিতে যান। তার দেশে ফেরার কথা ছিল ২২/২৩ আগস্ট। কিন্তু তিনি দেশে ফিরলেন প্রায় আট বছর পর ১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে তিনি হারিয়েছেন সবচেয়ে মূলবান সম্পদ মা-বাবা-ভাই-ভাবীদের। বিদেশে না গেলে তাকেও হয়তো একই পরিণতি বরণ করতে হতো। তিনি ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেছেন। অবশ্য এ বাঁচাকে তিনি বাঁচা বলে মনে করেন না।

সাপ্তাহিত সন্দ্বীপের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ রেহানা বলেছিলেন, ‘দেশে থাকলেই ভালো হতো, সবাই এক সাথে যেতে পারতাম।’

আকাশ ভেঙে পড়ার মতো দুঃসংবাদ শোনা সম্পর্কে শেখ রেহানা বলেন, ‘৩১ জুলাই আপা-দুলাভাইর সাথে জার্মানি যাই। আমরা জার্মান থেকে ব্রাসেলসে গিয়ে ছিলাম। ১৫ আগস্ট আমাদের প্যারিস যাবার কথা ছিলো। অই দিন ব্রাসেলসে বসে রেডিওতে শুনলাম ঢাকায় অভ্যুত্থান হয়েছে; গোলমাল চলছে। এ সংবাদ শুনে প্যারিস না গিয়ে আমরা আবার জার্মানী ফিরলাম। জামানীতে ফিরে সঠিক কোন খবর আমি পাইনি। প্রথমে শুনলাম বড় ভাই-মেঝো ভাইকে ওরা মেরে ফেলেছে। আব্বাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মা মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে এসেছেন। কয়েক মাস পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনে সংবাদ পাইনি। হয়তো আমি সহ্য করতে পারব না ভেবে আপা এই নির্মম সংবাদ লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। অবশ্য খবরের কাগজ ও রেডিও সংবাদ শুনেছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মতো একজন লোককে বাংগালীরা মেরে ফেলবে এটা কেমন কথা! কিছুতেই বিশ্বাস হতো না। সেই সময়গুলো দুর্বিসহ যন্ত্রণা আর অস্থিরতার মধ্যেই কেটেছে। সেই অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মাঝে শুনলাম আব্বা জেলে আছেন। আমিও বিশ্বাস করতে চাইতাম আব্বা বেঁচে আছেন। এখনো বিশ্বাস হয় না, আব্বা মারা গেছে- আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।’

শেখ রেহানার প্রবাস জীবনও কেটেছে দুর্বিসহ। প্রবাস জীবনের মধ্যে দেড় বছর তিনি ছিলেন দিল্লিতে। সারাক্ষণ প্রায় একাএকা তাকে ঘরে থাকতে হতো। অনেকটা বন্দীর মতো। নিরাপত্তার জন্য খোলামেলা চলাফেরা সম্ভব ছিল না। একা একা দুর্বিসহ স্মৃতি নিয়ে দিন কাটাবার ফলে শেখ রেহানা মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাবার মনোস্থির করলেন তিনি। শান্তিনিকেতনে ভর্তিরও ব্যবস্থা হলো। কিন্ত শেষ মুহুর্তে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হয়। কারণ পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলো না। ফলে শেখ রেহানাকে ঘরেই থাকতে হয়। বঙ্গবন্ধুর ফুপাতো ভাই মোমিনুল হক ওরফে খোকা ১৯৭৭ সালে দিল্লি গিয়ে তার অবস্থার দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন। পরে তাকে লন্ডনে নিয়ে যান। সেখানে তাকে কলেজে ভর্তি করা হয়। এ প্রসঙ্গে শেখ রেহানা সাপ্তাহিক সন্দ্বীপের সঙ্গে বলেন, ‘খোকা চাচা লন্ডনে কাজে গিয়েছিলেন এবং ১৫ আগস্টের ঘটনার পর দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তার আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিলে না। তার উপর থাকা-খাওয়া এবং পড়ালেখার খরচ চালাতে বিবেকে বাধছিলো। তাই একটা পার্ট টাইম চাকুরী খুজছিলাম। চাকুরীও পেলাম।’

শেখ রেহানার বিয়ে হয় ১৯৭৭ সালে। এ প্রসঙ্গে শেখ রেহানা জানান, ‘আমার স্বামী তখন ওখানে পড়াশুনা করেছিলেন। পারিবারিকভাবে ওর সাথে আমার বিয়ের কথাবার্তা বাবা-মা বেঁচে থাকতেই চলছিলো। অথচ আমার যখন বিয়ে হলো, মা-বাবা বেঁচে নেই। নিয়ম হলো, মা বাবা কন্যা সম্প্রদান করেন, কিন্তু আমার কপালে তা লেখা ছিলো না।’

রাজনৈতিক প্রসঙ্গ না তোলার শর্ত থাকলেও শেষতক কৌশলে এ প্রসঙ্গ তুললাম। তিনি বললেন, ‘স্কুলে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। কলেজে উঠে অবশ্য রাজনীতি এড়িয়ে চলতাম। মা’রও নিষেধ ছিলো। কিন্তু বড় ভাই চাইতেন আমি রাজনীতির সাথে জড়িত থাকি। আমার রাজনীতি না করার ব্যাপারে বড় ভাইর কাছে নালিশও আসতো। তখন সরাসরি রাজনীতি না করলেও মিছিল শুনতাম, খবরাখবর রাখতাম। এখন তো ওসব একেবারে পছন্দ করি না।

: কারণ কি?

: আপনি কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্ন করছেন।

: স্বাভাবিক কারলেই এ প্রশ্ন আসে, কারণ অপনার পিতা একজন বিরাট রাজনীতিক ছিলেন এবং তার পরিচয়ই আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয়।’

আমার কথায় নরম হলেন শেখ রেহানা। বললেন, ‘এ দেশে কিসের রাজনীতি বলুন। যে দেশে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতাকে হত্যা করা হয় সে দেশে আমার রাজনীতির প্রশ্নই ওঠে না।’ এর পর শেখ রেহানা কিছুটা অভিযোগের স্বরেই বললেন, ‘এত বড় নেতার লাশ পড়ে থাকলো, কেউ দেখতে গেলো না। খুনীরা দেশে-বিদেশে বড় বড় চাকরি পায়, পুরস্কার পায়। অমাদের সন্তানদের কি শিক্ষা দেব বলুন।’ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগকারীদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে বলা হলে শেখ রেহানা বলেন, ‘কি মন্তব্য করব। তাদের প্রতি করুণা হয়।’

এরপরে প্রশ্ন ছিল, রাজনীতিতে কবে আসবেন? উত্তরে শেখ রেহানা বলেছিলেন, ‘কোন দিন রাজনীতিতে যাব না।’

: শেখ হাসিনাও কিন্তু রাজনীতিতে আসতে চাননি।

: পরিস্থিতির কারণে তাকে রাজনীতিতে আসতে হয়েছে। অবশ্য কেউ কেউ তাকে পুতুল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলো। কিন্তু তা সে মোকাবিলা করতে পেরেছে। নিজের যোগ্যতায় তার পক্ষে অবস্থান দৃঢ় করে নেয়া সম্ভব হয়েছে।

: বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির বিকাশের জন্য আপনার অংশগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে।

: সে জন্য আমাদের একজনকে তো দিয়েছি। আমার পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। আমার ধৈর্য কম। হাসিনা আপার পক্ষেই রাজনীতি করা সম্ভব। আব্বার মতো সবাইকে ক্ষমা করে দেবার গুণ তার আছে। আমার তা নেই। অনেক কথা আছে, সব বলা যায় না।

: আপনার সময় কাটে কিভাবে?

: সংসার নিয়ে আছি। অবসরে পুরনো স্মৃতির আবর্তে ক্ষত-বিক্ষত হই।

অন্য এক প্রশ্নে উত্তরে শেখ রেহানা বলেছিলেন, ‘কাকে কি বলব বলুন। আজকে আব্বার বিরুদ্ধে যারা কথা বলেন তাদের অনেককেই এক সময় আব্বার অনুকম্পায় চলতে হয়েছে। আমাদের জমির ধান বেঁচা টাকায় খন্দকার মোশতাকের সংসার চলতো। অলি আহাদ তো বলতে গেলে আমাদের বাসায়ই থাকতেন। আজকের আমেনা বেগম আব্বার বিরুদ্ধে বাজে মন্তব্য করে। অথচ স্বাধীনতার আগের দিনগুলোতে জনসভায় যাবার আগে মা’র শাড়ি পরে যেতেন। তার একটা ভালো শাড়ি পর্যন্ত ছিলো না। আজকে অনেক নেতা আছেন যারা আব্বার ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছেন। অথচ এখন কেউ কেউ উল্টাপাল্টা কথা বলেন। আবদুর রাজ্জাকের কথাই বলেন না। আওয়ামী লীগ পুনঃজন্মের সময় কেউ কেউ বাকশাল পুনঃজম্মের প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আবদুর রাজ্জাক এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। তার বক্তব্য ছিলো, জনগণ এসময় বাকশাল স্বাভাবিক ভাবে নেবে না। অথচ কয়েকদিন পর নিজেই বাকশাল গঠন করে একটা কনফিউজড পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন। কোরবান আলীর কথা ধরেন। বর্তমান সরকারে যোগ দেবার কয়েকদিন আগেও লন্ডনে গিয়ে আমাদের বাসায় ছিলেন। স্বামীর স্বল্প আয়ে আমাদেরই চলতে কষ্ট হচ্ছিলো। তবুও তাকে যতদূর সম্ভব সমাদর করেছি। এর পর শুনলাম যে বর্তমান সরকারের সাথে হাত মিলিয়েছে। শেখ শহীদের কথা আর বলবেন না।’

রাজনৈতিক প্রসঙ্গ বেশ ভালো ভাবে তুলতে পারায় বেশ ফুরফুরা মেজাজে ছিলাম। আমি আরো একটু অগ্রসর হলাম। বললাম,  আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আপনাকে যদি কোনো কারণে প্রয়োজন হয় তখন আপনি কী করবেন? জবাবে শেখ রেহানা বললেন, ‘১৫ অগস্টের নির্মম ঘটনার পর আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। আওয়ামী লীগের কেউ যোগ দেবার প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে আসবে না। অনেকেই বঙ্গবন্ধুর লাশ ফেলে রেখে মন্ত্রিসভায় গিয়েছিলেন।

: তারা প্রাণ বাঁচাতেও তো যেতে পরে।

: এতো যাদের প্রাণের ভয় তাদের রাজনীতি না করাই ভালো। আসলে সেদিন আওয়ামী লীগের নেতারা রাস্তায় নামলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। অথচ কেউ টু-শব্দটি করলো না। কই তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামারুজ্জামান, মনসুর আলীতো প্রাণের মায়া করে খুনীদের সরকারে যাননি।

: শেখ হাসিনা আপনাকে রাজনীতিতে আসতে বললে কি করবেন?

: সোজা না বলে দেব।

: ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আপনার আসার সম্ভাবনা কতটুকু?

: মোটেই নেই। এ কথা আগেও বলেছি, এখনো বলছি। আপনাকেই তো কয়েকবার বললাম।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার সাক্ষাৎকার নিয়েছি ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ দেড় বছর বয়সী সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ-এর জন্য। তিনি অনেক কথায় মূল্যবান তথ্য দিয়েছেন। তখন তিনি জোর দিয়ে বারবার বলেছেন, রাজনীতিতে না আসার কথা এবং এখন পর্যন্ত তিনি সরাসরি রাজনীতির বাইরেই আছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভিত্তি যেভাবে প্রসারিত হয়েছে তাতে শেখ রেহানা আর কতদিন রাজনীতির দলীয় কাঠামোর বাইরে থাকতে পারবেন তা নিয়ে আমি খুবই সন্দিহান। মনে হচ্ছে, সক্রিয় রাজনীতিতে শেখ রেহানার অধিষ্টান সময়ের ব্যাপার মাত্র; এ হচ্ছে অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের ধারণা।

 

 

লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, মাই টিভি

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment