অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২০

গণতান্ত্রিক শাসনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখল করেন। বলা হয়, এর আগে জেনারেল জিয়া ও জেনারেল মঞ্জুর হত্যা, প্রতিমন্ত্রীর বাড়ি থেকে খুনি ইমদু গ্রেপ্তারের নাটকসহ একাধিক ঘটনার মাধ্যমে তিনি ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন বিচারপতি আবদুর রহমানের এক রহস্যজনক উক্তির মধ্য দিয়ে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার উক্তিটি বিচারপতি রহমান নিজে থেকে করেছেন নাকি এরশাদেরই একটি ছক ছিল তা পরিষ্কার নয়। তবে রটনা আছে, জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর এ বিচারপতি সমারিক সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবার ডাক পাবার অপেক্ষায় সব সময় ফিটফাট হয়ে রেডি থাকতেন। তবে বেশ কয়েক বছর পর পরপারের ডাক পেলেও তিনি আর সামরিক শাসকের ডাক পাননি। ধারণা করা হয়, অতি সহজে ব্যবহার করা গেছে বলে বিচারপতি রহমানকে আর কাছে টানেননি জেনারেল এরশাদ। অথবা এক প্রকার বস্তুর মতো ভেবেছেন, যা কেবল একবারই ব্যবহার করা যায়।

বিচারপতি সাত্তার ডেকে নিয়ে ক্ষমতা হাতে তুলে দিয়েছেন- এমন একটি বাহানা করে জেনারেল এরশাদ জাতির কাঁধে চেপে বসলেন।

এ ক্ষেত্রে সব সামরিক সরকারেরই ফর্মেট অভিন্ন। যে পথে জেনারেল আইউব থেকে শুরু করে জেনারেল জিয়া হেঁটেছেন। অবশ্য একই পথে হেঁটে জেনারেল মইন ইউ আহমেদ শেষতক ব্যর্থ হয়েছেন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিচক্ষণতা ও জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে। যে জনগণ ৭৫ সালে খুনি মোশতাকের কথা বিশ্বাস করেছে, যে জনগণ জিয়া ও এরশাদের কথায় আস্থাশীল হয়েছে, সেই জনগণই কিন্তু জেনারেল মইন ইউ আহমেদের বাহানা আর গ্রহণ করেনি। যদিও দলছুট অনেক নেতা যোগ দিয়েছিলেন উর্দীওয়ালার সঙ্গে; আর অনেকে ছিলেন ডাকের অপেক্ষায়। কিন্তু এর আগেই গণেশ উল্টেছে রাষ্ট্রের ওপর থাবা বিস্তারকারী সেনা প্রধানের।

শুরুর দিকে সবকিছু ঠিকঠাক চললেও ১৯৮৭ সালের দিকে এসে সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ বড় রকমের চাপে পড়েন। সেই সময়ের বাস্তবতায় বিভিন্ন অবকাঠামোর দৃশ্যমান উন্নয়ন হলেও নানান কারণে মানুষ জেনারেল এরশাদের ওপর বিরক্ত হচ্ছিল। সমান তালে বাড়ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ। একই সাথে তার মূল শক্তির ভিত, ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি জীবন্ত হচ্ছিল। এ অবস্থায় ১০ নভেম্বর সমাবেশে রাজপথে নূর হোসেন শহীদ হলে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে যায়। নূর হোসেনের মৃত্যু এরশাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। যদিও এখনো পরিষ্কার হয়নি, নিজের শরীরকে পোস্টার বানিয়ে নূর হোসেনকে রাজপথে নামিয়েছিল কারা, আর কেনই বা তাকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হলো। ষিয়টি রহস্য ঘেরাই থেকে গেছে। নূর হোসেনের শহীদ হবার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত সত্য, কিন্তু এর নেপথ্য সত্যটি প্রতিষ্ঠিত নয়; আজও থেকে গেছে অজানার গহবরে।

 

নূর হোসেন শহীদ হবার পর দিন ১১ নভেম্বর আটক করা হয় সে সময় সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে।  পেশাগত কারণে এ দুইজনকে আটকের সময় অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে আমিও স্পটে ছিলাম। এ দুজনের একজনকে আটক করা হয় পূর্বানী হোটেল থেকে রুমের দরজা ভেঙে; অপরজনকে পুশ ব্যাক করে বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে অন্তরীণ করা হয় নিজ গৃহে। তখন আমি সাপ্তাহিককে। যে কারণে স্পটে থাকার বাধ্যবাধকতা তেমন ছিল না। কিন্তু স্বভাবগত কারণে ছিলাম। যেটি অনেক ক্ষেত্রে এখন দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টারদেরও অনেকে করতে চান না। ঝামেলা শেষ হলে তথ্য সংগ্রহ করেন; এমনকি অনেকে স্পটের ধার দিয়েও হাঁটেন না; তারা নির্ভরতা সহজলভ্য নিউজ পোর্টালের ওপর। যে নির্ভরতার ক্ষেত্রে অনেক টেলিভিশন সাংবাদিকও কম যান না। প্রযুক্তির প্রসারের সুযোগে লুথা এ মানসিকতার কারণে টেলিভিশনের অনেক সাংবাদিক অ্যাসাইনমেন্টে গিয়ে দিনের আসমানের তারা গোনেন। ক্যামেরা পার্সন ফুটেজ নেন; আর রিপোর্টার অফিসে গিয়ে নিউজ পোর্টাল ঘাটেন কপি-কনভার্ট ও  পেস্ট করার জন্য। এরা পেশা নিয়ে কম ভেবে নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবেন। সম্ভবত এ কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে ধনবান ব্যক্তির হার আগের চেয়ে বেড়েছে; সাংবাদিকের সংখ্যাও বেড়েছে, অঁজপাড়ায়ও এখন সাংবাদিক দেখা যায় মাছির মতো ভনভন করতে। অবশ্য ডিজিটাল সাংবাদিকতা প্রসারের আগে এ সুযোগ ছিল কম। এরপরও যে কপি হতো না, তা কিন্তু নয়। তবে তা ধর্তব্যের মধ্যে নেয়ার মতো ছিল না এবং এ কর্মকে অতি অপকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আর তখনকার বসরা সহজেই বুঝতেন, কোনটি স্পটে থেকে করা আর কোনটি সংগৃহীত। কিন্তু ক্রমে এ বোঝার বসও কমে গেছে। ধান ভানতে শিবের গীতের প্রসঙ্গ এখন থাক।

সকালেই জানা গেলো, পূর্বানী হোটেলে একটা কিছু ঘটেছে। কারণ পুরো হোটেল পুলিশ ঘিরে রেখেছে। অল্প সময়ের মধ্যে চাউর হয়ে গেল, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ধরার জন্যই পুলিশের এ রণভঙ্গি। তবে এরশাদ সরকারের পুলিশ সীমালঙ্ঘন করেনি। কেবল দুইটি কক্ষের দরজায় কিছুক্ষণ পর পর নক করছিল। একটি কক্ষের দরজা অল্প সময়ের মধ্যে ভিড় থেকে খুলে দেয়া হয়। এ রুমে ছিলেন ওবায়দুর রহমান। কিন্তু অনবরত নক করা সত্ত্বেও অন্য রুমের দরজা আর খুলছিল না! এদিকে ফ্লোরে পুলিশের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল সাংবাদিকদের সংখ্যা। এক পর্যায় এমন হলো, সাংবাদিকদের ভিড়ের চাপে পুলিশকে বন্ধ দরজা থেকে দূরে অবস্থান নিতে হলো। পরিবেশ ক্রমেই পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এ সময় এলেন ডিএমপি কমিশনার নসরুল্লাহ খান। খুবই দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। যদিও এ পরিচিতি পরবর্তী সময়ে খালেদা সরকারের বালখিল্য রোষাণল থেকে তাকে রক্ষা করতে পারেনি। সব যোগ্যতা ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তাকে আইজিপি করা হয়নি। একই অবস্থা হয়েছে সেসময়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সালামের বিষয়ও। দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্ব পালনকারী মোহাম্মদ সালাম অতিরিক্ত আইজপি হবার পর তাকে আইজি করার সব আনুষ্ঠানিকতার পরও শেষ মুহূর্তে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার আসার কিছুক্ষণ পর এক পুলিশ সদস্য ডান হাতে এক চোখ ডেকে আহত হবার ভান করে অনেকটা ছুটতে ছুটতে বন্ধ দরজার দিকে আগালেন। তার অবস্থা দেখে হতচকিত সাংবাদিকরা তার জন্য পথ করে দেয়। বিষযটি অনুমান করার আগেই এ পুলিশ সদস্য বন্ধ দরজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন কাত হয়ে। এক ধাক্কায়ই দামি হোটেলের শক্ত দরজার দুর্বল লক খুলে গেল। এদিকে পূর্ব থেকে প্রস্তত হয়ে থাকা মহিলা পুলিশ সদস্যরা বেগম খালেদা জিয়াকে রুমের ভেতর ঘিরে ফেললো। এর পর তাকে স্কট অবস্থায় হোটেলের নিচ তলায় গাড়ি সামনে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু গাড়িতে তোলা নিয়ে আবার জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। বেগম খালেদা জিয়া গাড়িতে উঠতে চাচ্ছিলেন না; এ অবস্থায় যতটা সম্ভব সৌজন্য রক্ষা করে মহিলা পুলিশ সদস্যরা তাকে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছিল।

এদিকে বেগম জিয়ার প্রতি সাংবাদিকদের পুনঃপুনঃ অনুরোধ ছিল, কিছু বলার। সাংবাদিকরা একটি ম্যাসেজ পেতে চাইছিলেন। সকল অনুরোধকে ছাপিয়ে সে সময় তরুণ সাংবাদিক আমির খসরুর কণ্ঠ সবার কানে গেল, ‘ম্যাডাম কিছু বলেন!’  সেদিন বেগম খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের ওপর অনেক নির্ভর করতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছেন গিয়াস কামাল চৌধুরীর ওপর, সরকারেরও আস্থা ছিল তার ওপর। একই সময় সরকার ও বিরোধীদলের আস্থার সাংবাদিক হয়তো এখন নেই। কী কারণেই যেন সাংবাদিকরা হয়ে গেছে দলীয় পরিচয়ের ঝান্ডাবাহী!

দুপুর গড়িয়ে বিকেল না হতেই খালেদা জিয়া পর্ব নিয়ে সাংবাদিকদের ব্যস্ততা থিতিয়ে গেল। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর খবর এলো, বত্রিশে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। এ খবরে সাংবাদিকরা ছুঁটলেন ধানমন্ডিতে। কিন্তু বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন ডাকলেও নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছু পরে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনর জন্য নির্ধারিত কক্ষে এসে বললেন, ‘চলেন প্রেস ক্লাবে যাই; সেখানেই কথা বলবো’ এই বলে তিনি রওনা দিলেন। শেখ হাসিনার এ আচরণ আমার কাছে অন্যরকম ঠেকলো। সংবাদ সম্মেলনের জন্য বাসায় ডেকে কথা বলার জন্য কেন প্রেসক্লাবে যাবার প্রয়োজন পড়লো! মনে হলো, এটি আসলে এক রকম কৌশল; উদ্দেশ্য অন্য! বিষয়টি ফলো করতে সেদিন পুলিশের চেয়েও তার কাছে চলে গিয়েছিলাম। যে ছবি পরদিন কয়েকটি পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছে। এটি আমার ভালো লাগার দিক। কিন্তু অশ্বস্তির বিষয়ও সৃষ্টি হয়েছিলো টিকটিকির বিশেষ নজরে পড়ায়। এ ব্যাপারে সে সময় সিটি এসবিতে কর্মরত এলাকার এক ছোট ভাই আমাকে সতর্কও করেছিল। তবে কোন রকমের হেনস্থা হতে হয়নি আমাকে এরশাদ সরকারের আমলে। অথচ সাংবাদিক হিসেবে যা কিছু হেনস্থা হবার তা গণতান্ত্রিক হাসিনা ও খালেদা সরকারের সময়ই হয়েছি। এর মধ্যে ১৮ দিনের কারাভোগ পর্বও রয়েছে।

 

এরশাদে সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে যুগপথ আন্দোলন করলেনও দুই নেত্রী আবার ছিলেন একে অপরের প্রতিপক্ষ। এ অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়াকে যেভাবে আটক করা হয়েছে তাতে কেবল সংবাদ সম্মেলন করলে মিডিয়ায় সমান গুরুত্ব পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া বেগম জিয়া প্রসঙ্গেও পশ্ন আসতে পারে সংবাদ সম্মেলনে। সামগ্রিক অবস্থার বিবেচনায়ই হয়তো মিডিয়ায় সমানন্তরাল আলোচনায় থাকার কৌশল হিসেবেই বাসার সংবাদ সম্মেলন ডেকেও সাংবাদিকদের নিয়েই হয়তো শেখ হাসিনা প্রেসক্লাবে যাবার বাসনা প্রকাশ করেছিলেন। তবে বাসা থেকে বের হয়ে কয়েক গজ এগিয়েই ৩২ নম্বরের মাথায় পুলিশের বাঁধার মুখে পড়লেন শেখ হাসিনা। মহিলা পুলিশ তাকে ঘিরে ফেললো। সেখানে কিছু রুটিন ধাক্কাধাক্কি হলো। এক পর্যায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বাড়ির দিকে ফিরলেন। এ সময় তিনি বললেন, ‘আজ রাতই এরশাদের শেষ রাত।’

অবশ্য শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেও সে রাতই এরশাদের শেষ রাত হয়নি। বরং তার ‘শেষ রাত’ হতে আরো তিন বছরের বেশি সময় রাজনৈতিক দল ও জনগণকে অনেক কাঠখড় পোরাতে হয়েছে। তবে ২০১৪ সালের মতো সরকারকে হটাবার মানসে পেট্টোল বোমা মেরে শতশত মানুষ পোড়াতে হয়নি। আসলে ভাবতে অবাক লাগে, রাজনীতির নামে কতকিছুই তো অতি সহজে করা যায়, এমন কি পুড়িয়ে মানুষ মারাও!

লেখক: মাই টিভি’র প্রধান বার্তা সম্পাদক

ছবি: বিরোধী দলের কর্মসূচিতে নূর হোসেন এবং শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া আটকের দৃশ্য।

Please follow and like us:

Related posts