অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২১

সাপ্তাহিক সন্দ্বীপের কার্যকরী সম্পাদক আনোয়ারুল হক চলে যাবার পর আসেন মাহফুজউল্লাহ। এর আগে তিনি বিচিত্রায় ছিলেন। বিচিত্রাকে মডেল ধরেই সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ প্রকাশিত হয়েছিল বিধায় মাহফুজউল্লাহর যোগদান বিশেষ উৎসাহ যোগায় সবার মধ্যে। মালিক মুস্তাফিজুর রহমানও নতুন আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। কিন্তু আশার আলো নিভিয়ে দিলো মজ্জাগত তার পুরনো অভ্যাস। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলা ও ডিকটেড করার পুরনো অভ্যাস তিনি ত্যাগ করতে পারেননি। ফলে অল্প কিছু দিনের মধ্যে ‘ফাক ইট আউট’ বলে চলে গেলেন মাহফুজউল্লাহ ভাই। অধিকতর হতাশায় নিমজ্জিত হলো পুরো টিম। অতি আশার আলো হঠাৎ নিভে গেলে যে দশা হয়!

হতাশার এ রাজ্যে নতুন কাণ্ডারী হয়ে এলেন নাজিম উদ্দিন মানিক। তাকে নাকি বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘এখানে ক্ষণিক ওখানে ক্ষণিক, তার নাম নাজিমউদ্দিন মানিক।’ সম্ভবত এ গল্প দৈনিক বাংলার বাণীতে কাজ করার সময় ওবায়দুল কাদেরের কাছে শুনেছি।

মানিক ভাই প্রথমেই সবাইকে ওয়েজবোর্ডের আওতায় আনলেন। আমার বেতন ও মর্যাদা দুটোই বাড়লো; কমলো নূরুল হাসান খান ও আফরোজা নাজনীনের। বাম চেতনার নূরুল হাসান খানের মন খুবই খারাপ; তার দুঃখে ব্যথিত হলাম আমিও। কারণ সে ছিল আমার খুবই কাছের বন্ধু, এখনো সে আমার ঘনিষ্ঠদের একজন। দুজনের বৈশিষ্ট্যও প্রায় কাছাকাছি, তবে এলকোহলের প্রতি তার অনুরাগ আমার চেয়ে অনেক বেশি। তার সাথে সম্পর্ক এতোই গভীর ছিল যে তার মনোকষ্ট আমাকেও ব্যথিত করলো।  এদিকে বিরক্ত হলাম আফরোজা নাজনীনের ওপর। পদাবনতি হলে ব্যথিত হওয়া স্বাভাবিক হলেও কান্নাকাটির বিষয়টি আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না।

এদিকে, মালিকের আচরণের কারণে মানিক ভাইও বেশি দিন সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে টেকেননি, পরে অবশ্য মানিক ভাই’র সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে দৈনিক নবঅভিযানে; আমার প্রথম দৈনিক আর সম্ভবত মানিক ভাইর শেষ চাকরি। অস্তিমজ্জায় আওয়ামী চেতনা ধারণকারী নীতিবান এই সাংবাদিকের শেষ জীবন কেটেছে দারুণ অর্থ কষ্টে।

সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে মানিক ভাইর পর এলেন বেলাল চৌধুরী। কবি হলেও ভারত বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন দীর্ঘ সময়। রটনা আছে, ভারতীয় দূতাবাসের মালিকানায় ভারত বিচিত্রা যত না ছিল পত্রিকা; তার চেয়ে বেশি ছিল পাকমনা সাংবাদিকদের বিপরীত সাংবাদিকদের সহায়তা প্রদানের কেন্দ্র। নিন্দুকদের রটনা, সাংবাদিক লালনের অর্থায়ন কেন্দ্র ছিল ভারত বিচিত্রা। তবে অমি বেলাল চৌধুরীকে আওয়ামী ঘেষা সাংবাদিক হিসেবেই চিনি। তিনি যোগ দেবার প্রথমেই বললেন, সাজেদা চৌধুরীর একটা ইন্টারভিউ করো। কিন্তু এ বিষয়ে আমার খুবই অনীহা ছিল। কারণ, এর আগে যতবার ইন্টারভিউ করেছি তার প্রতিবারই কোনো না কোনো ত্রুটি ধরে সাজেদা চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ধরনের ঘটনা অন্তত সাত-আটবার ঘটেছে। ফলে আমি আর তার মুখোমুখি না হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত রাখা গেলো না বেলাল চৌধুরীর কারণে। সাজেদা চৌধুরীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত থেকে আমাকে সরিয়ে আনার কিছু দিন পর তিনিও সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে সরে গিয়েছিলেন। তবে বেলাল চৌধুরী কিভাবে সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ ছেড়ে ছিলেন তা জানি না। কারণ তার আগেই আমি ছেড়েছি; ইস্যু বিবিসির সাংবাদিক আতাউস সামাদ।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সময় সাংবাদিকদের স্বাধীনতার অতি তেজ এবং এরশাদের কড়া নিয়ন্ত্রণে সে সময় এক গুমোট অবস্থা বিরাজ করছিল। পত্রিকাগুলো ছিল নিয়ন্ত্রিত, সে সময় সবেধন মনি বিটিভি শফিক রেহমানের ভাষায় ছিল সাহবে-বিবি-গোলামের বাক্স। আর একমাত্র রেডিও ছিল আর এক কাঠি সরেস!

এদিকে প্রেস নোটের মাধ্যমে পত্রিকাগুলো মোটামুটি নিয়ন্ত্রণ করা গিয়েছে। কিন্তু তাতে সামরিক শাসকের তেমন লাভ হচ্ছিলো না। কারণ বিবিসি ছিলো উম্মুক্ত। আর স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে এরশাদ সরকারের শেষদিন পর্যন্ত বিবিসির বাংলা সার্ভিস ছিল বাংলাদেশে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম। সন্ধ্যায় বিবিসির খবর শোনার জন্য অনেকেই তড়িঘড়ি করে ছুঁটতেন বাসায়, যারা তা পড়তেন না তারা ভীড় জমাতেন বিভিন্ন দোকানে। এর ফলে রেস্তোরাঁ, মুদি দোকান থেকে শুরু করে পান-বিড়ির দোকান ঘিরে মোটামুটি বড় ধরনের জটলা সৃষ্টি হয়ে যেতো। শুধু তাই নয়, বাস থামিয়ে বিবিস সংবাদ শোনার মতো ঘটনাও ঘটেছে এরশাদ সরকারের সময়। ফলে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সামরিক শাসক এরশাদের প্রাণান্তকর চেষ্টা হালে পানি পাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে মাথা গরম করে ফেললেন জেনারেল এরশাদ। আতাউস সামাদ পড়লেন সমারিক শাসক জেনারেল এরশাদের রোষানলে।

অবশ্য সামরিক শাসকের রোষানলে পড়া আতাউস সামাদের পেশাগত জীবনের সঙ্গে ওতপোতভাবে জড়িত ছিল। তার পেশাগত জীবন কখনো বিপদমুক্ত ছিল না। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আতাউস সামাদের কাজ শুরু হয়েছে সামরিক জান্তার আমলে। তিনি বিবিসির জন্য নিয়মিত কাজ শুরু করেন ১৯৮২ সালে, এর আগে আতিকুল আলমের সাময়িক অনুপস্থিতির দিনগুলিতে বদলি সাংবাদিক হিসাবে বিবিসির সঙ্গে তিনি যুক্ত ১৯৭৭ সাল থেকে। তিনি ১৯৫৯ সালে দৈনিক সংবাদে যোগ দেন, সেটিই কোনো দৈনিকে তার প্রথম চাকরি। তখন চলছে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। ১০ বছর শাসন চালিয়ে আইয়ুব খান যখন বিদায় নেন তখন আসেন আরেক সেনাশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এ জেনারেল তো চালিয়েছেন গণহত্যা। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস) এর বিশেষ সংবাদদাতার চাকরি নিয়ে আতাউস সামাদ যান ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে। কিন্তু ‘আমি যাই বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে- এ প্রবাদের মতো আতাউস সমাদ পড়েন জরুরি অবস্থার মধ্যে, ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে জারি করলেন জরুরি অবস্থা। সেই সাথে অরোপ করা হয় কঠোর সেন্সরশিপ।

১৯৭৬-এর আগস্টে যখন আতাউস সামাদ দেশে ফেরেন তখন বাংলাদেশে চলছে প্রথম দফার সামরিক শাসন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২’র মার্চ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বাভাবিক আইনে দেশ চলছিল। ঠুনকো এ অবস্থা পদদলিত করে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। নানান কৌশলে এ সামরিকযান্তা ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আর আতাউস সামাদ বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে ঢাকায় কাজ শুরু করেন ১৯৮২ সালের অক্টোবর থেকে। অর্থাৎ যুদ্ধ, সেন্সরশিপ, সামরিক শাসন ও জরুরি আইনের শাসনের মধ্যে দিয়ে কেটেছে তার পেশাগত জীবন।

সামরিক শাসনের বিধিনিষেধ না মানার জন্য ঝামেলায় পড়ার আতঙ্ক নিয়ে কোনো রকম প্রাণে রক্ষা পেলেও শেষতক তিনি আর রক্ষা পাননি। তবে বিবিসি’র আর এক সাংবাদিক নিজাম উদ্দিনের মতো জীবন দিতে হয়নি; গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। আর এতো বড় সাংবাদিকের গ্রেপ্তার হবার বিষয়টি সন্দ্বীপ থেকে আমার বিদায় নেবার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে জড়িত।

১৯৮৭ সালের নভেম্বরে আতাউস সমাদ গ্রেপ্তার হলেন। মুস্তাফিজুর রহমান রাতে অফিসে এসে আমাকে ডাকলেন। বললেন, ছামাদ ছাব গ্রেপ্তার হইছে, জানেননি? বললাম, জানি। তিনি বললেন, তাইলে হেতের একটা ইন্টারভিউ করেন। আমি বললাম, কিভাবে করবো, তিনি তো এরেস্ট!

: হেতে কি, আছে তো হিজিতে।

: যেখানেই থাক, আসলে তো সে এরেস্ট; পুলিশ পাহারায় আছে।

মুস্তাফিজ সাহেবের কানে আমার কথা গেল বলে মনো হলো না। তিনি বললেন, বেতন হাইছেন নি।

: কিভাবে পাবো, মাস তো শেষ হয়নি।

: হাছা নি!

এই বলে ড্রোয়ার থেকে একশ টাকার একটা বান্ডেল বের করে বললেন, আন্নের যা লাগে নেন। আমি গুনেগুনে এক হাজার টাকা নিলাম। তিনি নিজের হাতে আরও এক হাজার টাকা দিলেন। এরপর বললেন, এইডা আনহের বোনাস, ছামাদ ছাবের ইন্টারভিউ করণই লাগবো।

সে সময় মাসিক বেতনের অর্ধেকের বেশি টাকা বোনাস হিসেবে পেয়ে বেশ গরম বোধ করলাম। বললাম, ঠিক আছে মোস্তাফিজ ভাই দেখি..

: আরে দেহনের কিছু নাই, আনহে হারবেন; আই জানি…!

পর দিন ফিটফাট হয়ে দুপুরের পর পিজি হাসপাতালে গেলাম। আগে আতাউস সামাদের রুম সম্পর্কে ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে গেলাম তার রুমের দিকে। দেখি কড়ি ডোরে মুখে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়ানো। সেখানে এমন একটা ভাব নিলাম আমি কোনো সংস্থার লোক। বললাম, সবকিছু ঠিক আছে! কাউকে ঢুকতে দেবেন না। এই বলে আমি ঢুকে গেলাম। আমার নাটক নিখুঁত হোক অথবা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা কম মেধার হোক; তারা আমাকে কোনো বাধা দেয়নি। করিডোরে মাঝামাঝি একটি রুমের দরজায় দুই পুলিশ দাঁড়ানো। তাদের দিকে অর্থপূর্ণ লুক দিলাম। তারা আমাকে সালাম দিলো। আমি আরো ভাব নিলাম। বুকের ধুকধুকানী উপেক্ষা করে রুমে ঢুকে পড়লাম।

আতাউস সামাদ আমাকে চিনতেন না। আমি বলাম, সামাদ ভাই আমি সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে কাজ করি; আপনার ইন্টাভিউ করতে এসেছি। তিনি উদ্বেগের কণ্ঠে বললেন, করেছো কী; বিপদে পড়বে তো। আমি বললাম, আপনি ইন্টারভিউ না দিলে আমার আরও বেশি বিপদ হবে। তিনি বললেন, ঠিক আছে দ্রুত বলো।

মিনিট দশেক কথা বলে কাজ সেরে নিলাম। কিন্তু ততক্ষণে অজানা ভয় আমাকে বেশ পেয়ে বসেছে। যার লেশমাত্র রুমে ঢোকার আগে ছিল না।’ করেছো কী; বিপদে পড়বে তো’ আতাউস সামাদের এ মন্তব্য আমাকে বাস্তবতায় নিয়ে গিয়েছিল। তবে শেষতক কপাল গুণে কোনো ঝামেলা ছাড়াই পিজি হাসপাতার ত্যাগ করতে পেরেছিলাম। তবে বের হবার সময় পুলিশের সঙ্গে আর পাকনামি করতে যাইনি।

পিজি থেকে সোজা চলে গেলাম ফকিরেরপুল অফিসে। লিখেও ফেললাম দ্রুত। আইটেম পড়ে সহকারী সম্পাদক পারভেজ আলম চৌধুরী বললেন, আধা পৃষ্ঠা হবে। এরপর আমি কার্যকরী সম্পাদক বেলাল চৌধুরীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তিনি সাধারণত দুপুরের পর এলেও সেদিন সন্ধ্যায়ও আসছিলেন না। তবে এ নিয়ে আমার কোনো তাড়া ছিল না। এদিকে অন্যান্য দিন সন্ধ্যার পর অফিসে এলেও সেদিন মুস্তাফিজুর রহমান এলেন সন্ধ্যার আগে। তিনি অফিসে এসেই আমাকে ডাকলেন। বললেন, ছামাদ ছাবরে হাইছেননি! আমি মাথা নেড়ে বললাম, তৈরিও করেছি। আমার এ বাড়তি কথাই আসলে ভুল হয়ে গিয়েছিল। তিনি বললেন, নিয়া আন; আই চাই। আমি বললাম, বেলাল ভাই আসুক, সে দেখে আপনাকে দেবে।

আমার এ শৃংখলার কথা তার ভাবনার জগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলো। কড়া কণ্ঠে বললেন, ‘আননে নিয়া আন, কী মনে করেন; আন্নেরা সাম্বাদিক, আই কিছু না।’ অবস্থা বেগতিক দেখে আমি চুপ করে গেলাম। নিউজ রুমে এসে দেখি, বেলাল ভাই এসেছেন। তাকে আতাউস সামাদের সাক্ষাৎকারটি দিয়ে বললাম, মুস্তাফিজ ভাই দেখতে চেয়েছেন। এর পর তার সামনে ড্রয়ারের চাবি রেখে বললাম, বেলাল ভাই এই চাবি; আমি আর কাজ করবো না। সব শুনে তিনি আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বহু দিন থেকে তেঁতে থাকা আমার রাগ আর কমছিল না। বললাম, না বেলাল ভাই; এ অপমানের মধ্যে আমি আর কাজ করবো না। তার কাছে ম্যাসেস খুবই পরিষ্কার হয়ে গেলো। বললেন, দাঁড়াও তোমাকে ছালাম জানাই। এই বলে তিনি পুলিশি স্টাইলে সেলুট করার মতো ভঙ্গি করলেন। তবে পুরো দাঁড়াতে পারেননি। সম্ভবত কবি বেলাল চৌধুরী তখন কিছুটা ‘বাংলার’আবেসে ছিলেন। আমিও  পেশাগত অহমের আবেশে নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে অনিশ্চয়তায় পা বাড়ালাম।

লেখক: মাই টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক

Please follow and like us:

Related posts