অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২২

সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ ছাড়ার সপ্তাহখানেক পর এরশাদ মজুমদারের সঙ্গে দেখা হলো প্রেসক্লাবে। বরাবরই প্রেসক্লাব এলাকায় আমি কম যাই। শুধু তাই নয়, সাংবাদিকদের নানান সংগঠনের সাথেও আমার দূরত্ব রয়েছে। অথচ এর উল্টোটা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। ইউনিয়ন নেতা হিসেবেও আমার পরিচিতি হতে পারতো। কিন্তু ইউনিয়নের পথে অমি হাঁটিনি; প্রায় একই কারণে ছাত্র রাজনীতিতে পথ চলা থামিয়ে দিয়েছিলাম অনেকটা মধ্য গগনে থাকাকালে।

ছাত্র রাজনীতিতে পথচলা বন্ধ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি বা চালিয়ে গেলে লাভবান হতে পারতাম- সে হিসাব মিলাতে অনেক অংক কষতে হবে হয়তো। এমনকি এ অংক মিলাতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু শফি আহমেদসহ অনেকের সহায়তা নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে; আর এ হবে এক জটিল অংক! তবে অতি সহজ অংকে বলা চলে, ইউনিয়ন ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন থেকে দূরে থেকে আমি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এ বোধের পরও সাংবাদিক ও শিক্ষকদের রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি ও বিভাজনের বিষয়টি মেনে নেবার চেষ্টা আমার জন্য খুবই বেদনার অনুশীলন! আমি মনে করি, ধর্ষণ মামলার আসামি ট্রাক ড্রাইভার ও মাওলা আইনের দৃষ্টিতে একই মাত্রায় অপরাধী হলেও সামাজিক দৃষ্টিতে এ অপকর্মে ট্রাক ড্রাইভার আর মাওলানা সাহেবকে ভিন্নভাবে বিচেনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে বেশি ঘৃণা করা হয় মাওলা সাহেবকে। ধর্ষণ মামলায় মাওলা এবং দলবাজিতে সাংবাদিক ও শিক্ষকদের এক কাতারেই দাঁড় করাতে ইচ্ছা করে আমার! যদিও জানি, আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় মোটেই কিছু আসে যায় না। সাংবাদিকতার সঙ্গে নিপেক্ষতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত বলে ধরে নেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটলেও ১৯৯৩ সাল থেকে অতি দলীয় হবার কারণে সাংবাদিকতা পেশা থেকে নিরপেক্ষতা প্রায় সবটুকুই নিঃশেষ হয়ে গেছে, এ ক্ষেত্রে দলবাজি কাজ করেছে মরুভূমির বালুতে পানি শুষে নেবার মতো। আর মিডিয়ার মালিকানায় মাফিয়া পুঁজির অতি অনুপ্রবেশের ফলে সাংবাদিকতা পেশা অনেকটাই হয়ে গেছে আর দশটা পেশার মতো; বটগাছ আর কলাগাছ এক সারিতে দাঁড় করাবার মতো। তবে কেবল সংবাদিকতা নয়, সকল পেশা রাজনৈতিকভাবে এতো বেশি বিভাজিত হয়েছে যে, নিরপেক্ষ থাকার মানেই হচ্ছে অরণ্যে দলছুট মেষ শাবকের মতো অবস্থা। পেশাগত নিরপেক্ষতাকে আরও অনেক কিছু বলে অভিহিত করা যায়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আশিকুর রহমান সঙ্গে কথা বলে অতি সম্প্রতিক আমার এ ধারণাই হয়েছে।

সাপ্তাহিক রিপোর্টারে থাকাকালে সাইফুল ইসলাম তালুকদারের মাধ্যমে ১৯৮৫ সালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য হবার পর ইউনিয়নে বেশ সক্রিয় ছিলাম। এর ধারাবাহিকতায় বিপুল ভোটে অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত ইউনিয়নে বেশ সক্রিয় ছিলাম এবং প্রতিটি নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। নির্বাচন এলে অনেক সিনিয়র সাংবাদিক নেতা গ্রুপ ভোটের জন্য আমার সহযোগিতা চাইতেন খুবই দাবি নিয়ে। অন্যের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবার মজ্জাগত নিজের জন্য ক্ষতিকর স্বভাবের কারণে অনেকের সঙ্গেই আমার নীরব হৃদ্যতা রয়েছে। ফলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনে আমি গো-হারা হারবো বলে আমার স্ত্রী নিশ্চিত ভবিষ্যতবাণী করলেও প্রথম বার অংশ নিয়েই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচিত হবার পর ভেতরের চিত্রটা একটু বেশি দেখে ফেলায় ইউনিয়নের প্রতি এক রকম অনীহা সৃষ্টি হয়েছিল। এ অনীহার বিরূপ প্রভাবে পেছাতে পেছাতে আমার অবস্থা হয়েছে প্রায় একঘরে হবার মতো। এরপরও কালেভদ্রে কোনো না কোনো কারণে প্রেসক্লাবে যাওয়া হয়। তবে প্রথমবারের মতো প্রেসক্লাব নির্বাচনে প্রচারণার কাজে সক্রিয় ছিলাম গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬। এ কাজে নিয়োজিত করার পেছনেও কারণ ছিল এক গ্রুপ ভোটারের সঙ্গে ব্যক্তিগত গভীর সম্পর্ক এবং যার পক্ষে কাজ করেছি তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের ৬৪ বছরের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। যে ধরনের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে একজন নারীকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়ার মধ্য দিয়ে সম্প্রতি।

এভাবে কোনো না কোনো কারণে কালেভদ্রে প্রেসক্লাবে যাওয়া হয়। সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ ছাড়ার সপ্তাহখানেক পর প্রেসক্লাবে গিয়েছিলাম। যাদের সঙ্গে দেখা হলো তাদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তিগত খোঁজখবর নিলেন এরশাদ ভাই, এরশাদ মজুমদার। বললেন, কী করছো তুমি এখন; সন্দ্বীপে আছো তো? আমি বললাম, না; কয়েকদিন আগে ছেড়ে দিয়েছি। তিনি চিন্তিত হয়ে বললেন, বোকামি কেন করলে; পত্রিকা তো ভালো হচ্ছে! আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে বললেন, ঠিক আছে; কাল আমার অফিসে আসো। সাপ্তাহিক ফসল বের করছি; মুকুল দেখছে। তুমি তার সঙ্গে কাজ করো। এরপর এরশাদ ভাই বললেন, তবে পত্রিকার অর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না।

পরদিন আমার সদ্য পরিত্যক্ত সাপ্তাহিক সন্দ্বীপের অনেকটা উল্টো দিকে সাপ্তাহিক রিপোর্টার অফিসে গেলাম দুপুরের কিছু পর। অফিস পুরনো কিন্তু পত্রিকা নতুন; সাপ্তাহিক ফসল। দায়িত্বে আছেন শফিকুল আজিজ মুকুল; মালিকানায় যথারীতি এরশাদ মজুমদার।

মুকুল ভাই’র সঙ্গে সেদিনই প্রথম পরিচয়। কিন্তু তার আচরণে এটা বোঝার উপায় ছিল না। তিনি অনেক বিষয় নিয়ে কথা বললেন। ব্রিফ করলেন নানান বিষয়ে। তিনি রাজনীতিকদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখতে বলতেন। এ ক্ষেত্রে সে সময় তার পছন্দের নেতা ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। কাকতালীয়ভাবে আমারও পছন্দের ছিলেন মিজান চৌধুরী, যিনি ইউনিয়ন পর্যায় থেকে জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন; হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীও। একই সময় মুকুল ভাই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বোঝার জন্য যোগাযোগ রাখতে বলেছিলেন ব্যারিস্টার আবুল হাসনাতের সঙ্গে। ঘটনাচক্রে তার সঙ্গেও আমার আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। আমাকে ব্রিফ করার সময় মুকুল ভাই সবচেয়ে জোর দিলন, সংসদের ওপর। বললেন, সংসদ কাভার করতে পারলে এক অর্থে পুরো দেশ কাভার করা হয়; এর সাথে ক্ষমতা কাঠামোরও অনেকখানি কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব। ১৯৮৮ সালের মুকুল ভাইর এ বক্তব্য আজও যথাযথ বলে মনে হয়। সে সময় চলছিল এরশাদের রাবার স্টাম্প পার্লামেন্ট। এর আগে ৮৬ সালের সংসদ দিয়ে আমার সংসদ রিপোর্টি শুরু হয় দৈনিক নবঅভিযানে থাকাকালে চিফ রিপোর্টার খায়রুল আলম বকুলের কারণে। তিনি জোর করে আমাকে পঠিয়েছিলেন; প্রথম সংসদ ভবনে গিয়েছিলাম আলিমুজ্জামান হারুনের সঙ্গে, এর পর নিজের মতো করে দ্রুত এগিয়েছি। একই অভিজ্ঞতায় ২০০৪ সালে দৈনিক আমাদের সময়ে থাকাকালে মমতাজ মৌকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংসদে পাঠিয়েছিলাম চিফ রিপোর্টারের ক্ষমতা প্রয়োগ করে। আমার এ আচরণে অনেক কেঁদেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের মেধাবী ছাত্রী মমতাজ মৌ।

রাজনীতিক থেকে সাংবাদিক হওয়া মুকুল ভাই অল্প সময়ের মধ্যেই আমাকে আস্থায় নিলেন। এ আস্থার কারণেই প্রায় দশ বছর পর ১৯৯৮ সালে তিনি বাংলার বাণীর নির্বাহী সম্পাদক হবার পর তার টিমে আমাকে নিয়েছিলেন; আমাকে দেয়া হয় ক্রাইম ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিট।

মুকুল ভাই ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করতেন। এরপর আওয়ামী যুবলীগ, পরে আওয়ামী লীগ, অতঃপর বাকশাল; আবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে, শেখ ফজলুল হক সেলিমের পছন্দের ব্যক্তি হিসেবে। একই কারণে বাংলার বাণীর সহকারী সম্পাদক ও পরে নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। লেখাপড়া জানতেন বলে তাজউদ্দিন আহমেদের প্রিয়পাত্র ছিলেন শফিকুল আজিজ মুকুল। তবে শেষতক আওয়ামী রাজনীতিতে বেশি সুবিধা করতে পারেননি তিনি। সম্ভবত এটি তার বেশি লেখাপড়া করার ফল। বেশি লেখাপড়া করলে বা স্বাধীনচেতা হলে আমাদের দেশের রাজনীতিতে সুবিধা করা বেশ কঠিন। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপির পার্থক্য মিলিমিটারে মাপা যায়।

মুকুল ভাইর বদান্যতায় বাংলার বাণীতে যোগ দেবার এক সপ্তাহের মধ্যে সন্ত্রাস দমনে দুই বছরমেয়াদী আইন করার সরকারি সিদ্ধান্ত নেয় শেখ হাসিনার প্রথম সরকার। এ খবর পেয়েছিলাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠক সূত্রে, সে সময়ের যুগ্ম-সচিব (রাজনৈতিক) জানিবুল হকের সঙ্গে পূর্ব সম্পর্কের কারণে। এ রিপোর্ট বেশ গুরুত্ব দিয়ে বাংলার বাণীতে আমার নামে ছাপা হয়। কিন্তু সে সময়ের সিটি এডিটর আশরাফ খান অতি-সম্পাদনা করে রিপোর্টে সোর্স হিসেবে জানিবুল হকের নাম দিয়ে দেয়ার বহু বছরের যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া আমার একটি মূল্যবান সোর্স চিরতরে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখন মাটির নিচ থেকে সন্ত্রাসী ধরার সংকল্প ব্যক্ত করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. নাসিম। বৈঠকে সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়টি ফাঁস হওয়ায় মাথা গরম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন। এ বিরক্তির বিষয়টি আমাকে জানিয়েছিলেন জনসংযোগ কর্মকর্তা নাসির ভাই।

তবে বাংলার বাণীতে আমি বেশি দিন ছিলাম না হাউজের পরিবেশে বিরক্ত হয়ে। থাকতে চাইলেও কতদিন থাকতে পারতাম তা নিয়েও সন্দেহ আছে। কারণ আমার ব্যাপারে পত্রিকার মালিক-সম্পাদক শেখ সেলিমের কান শুরুতেই ভারি করা হয়েছিল। এরপর গিয়েছিলাম দৈনিক দিনকালে। কিন্তু সেখানেও আরও সমস্যা; বেতন সংকট। এর উপর মঘা আয়োর্বেদিক চিকিৎসার নামে একটি প্রতারক প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লার ছেলের বিরোধ নিয়ে প্রচলিত প্রচারণার বাইরে আমার একটি রিপোর্ট ছাপা হয় দৈনিক দিনকালে; এ রিপোর্টে বিরক্ত কর্তৃপক্ষ; পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কাজী সিরাজ রটিয়ে দিলেন, আমি আওয়ামী লীগের পোষ্য। একে তো এসেছি বাংলার বাণী থেকে, এর উপর কাজী সিরাজের ভাষ্য মতে আওয়ামী লীগের পোষ্য সাংবাদিক। সব মিলিয়ে দৈনিক দিনকালে বেশি দিন থাকা হয়নি, ছিলাম নয় মাস। এদিকে সাপ্তাহিক ফসলে অনিশ্চিত অবস্থান বেশি দিন থাকতে হয়নি। সাপ্তাহিক ফসল থেকে মোজাম্মেল ভাই, খোন্দকার মোজাম্মেল হক, সাপ্তাহিক সুগন্ধায় নেন আমাকে।

একদিন দুপুরে ইকবাল কবির ফকিরেরপুলে সাপ্তাহিক ফসল অফিসে এসে ফিসফিস করে বললো, ওস্তাদে দেখা করতে বলেছে; নতুন দোকান লইছে। ওস্তাদ মানে মোজাম্মেল ভাই; আর নতুন দোকান মানে নতুন পত্রিকা। ওই দিন বিকেলে ইকবাল কবিরের দেয়া ঠিকানা অনুসারে ৫৫-৫৬ মতিঝিলে শরীফ ম্যানশনের তৃতীয় তলায় একটি অফিসে মোজাম্মেল ভাইর সঙ্গে দেখা করলাম। শুরু হলো সাপ্তাহিক সুগন্ধায় আমার যাত্রা; কলেজে আমার প্রিয় শিক্ষক ও ব্যক্তিগত জীবনে নির্ভরতার ব্যক্তিত্ব নোমান স্যারের ভাষায়, যুদ্ধের সূচনা! এরপর সুগন্ধা থেকে সুগন্ধা কাগজ, এরপর ১৮ দিনের কারাবাস শেষে কিছু দিন টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা, এরপর আবার দুঃস্বপ্নের পথ চলা!

লেখক: মাই টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক

Please follow and like us:

Related posts