‘ড্যান্ডি খাইলে মনের দুঃখ থাকে না’

বয়স খুব একটা বেশি না, বড়জোড় ৮/৯ বছর। এই বয়সে যাদের বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা এরাই এখন সবচেয়ে বিপথগামী। মরণ নেশা ড্যান্ডির নেশায় শত শত পথশিশু আসক্ত হয়ে পড়ছে।
সাময়িক সুখের প্রত্যাশায় অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে তাদের জীবন। জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। মাদক বহনের ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে এসব শিশুরা। এমনি কিছু শিশু দেখা মিলছে ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন স্থানে।

সরেজমিন দেখা যায়, শহরের টাঙ্গন ব্রীজের নিচে, ঠাকুরগাঁও রেলওয়ে স্টেশন এলাকায়, বাসটারমিনাল, শান্তিনগর, হাজীপাড়া সাংবাদিকের মাঠ, সেনুয়া ব্রীজের নিচে, আশ্রমপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, শাহপাড়া, শিমুলতলা, খালপাড়াসহ আরো বেশ কিছু এলাকায় কিছু পথশিশু বসে পলিথিন দিয়ে কি যেন করছে। তাদের নাম জিজ্ঞাসা করলেই উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে বলে, আপনারা এখানে কেন আইছেন? আবার তাদের মধ্যে জোড় গলায় আশরাফুল নামে একজন বলে, ড্যান্ডি বানাইয়া খাই। এটি খাইলে মনের দুঃখ থাকে না। ক্ষুধাও লাগে না।
সন্ধ্যা হলেই দেখা যায় অনেক পথশিশুদের। বসে বসে সেবন করছে ড্যান্ডি নামক এই নেশাদ্রব্য। জুতা কিংবা ফোমে ব্যবহৃত সলিউশন (আঠা) পলিথিনে ভরে কিছুক্ষণ পরপর মুখের সামনে নিয়ে শ্বাস টেনে নেশা করে তারা। মাদক সেবনের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে খুনোখুনিরও ঘটনা ঘটছে অনেক সময়। তবে শিশুদের কাছে এটি বিক্রি না করার জন্য ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চেয়েছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০ থেকে ৩০ টাকায় এক ধরনের জুতার গাম কেনে শিশুরা। প্রায় সব এলাকার দোকানেই এসব গাম পাওয়া যায়। পলিথিনের ব্যাগে আঠাল ওই পদার্থ নিয়ে কিছুক্ষণ ঝাঁকানো হয়। তারপর পলিথিন থেকে নাক বা মুখ দিয়ে বাতাস টেনে নেয়। এই নেশা ড্যান্ডি নামে পরিচিত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৮ থেকে ১০ বছর বয়সের শিশুরা সাধারণত গাঁজা, সিগারেট ও গাম সেবন করে। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা ফেনসিডিল ও হেরোইন সেবন করে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-তরুণদের নেশার অন্যতম উপকরণ ইয়াবা। তবে অধিকাংশ পথশিশু ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত।
শহরের টাঙ্গন ব্রীজের নিচে কথা হয় ১০ বছরের শিশু আরফিন নামের একজনের সাথে সে জানায়, আমার সঙ্গে আমার অনেক বন্ধুরা থাকে। তারা সবাই আঠা খায়, তাই ওদের দেখা-দেখি আমিও আঠা খাই। রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় গিয়ে দেখা যায় রেলের ধারে বসে থাকা দুই পথশিশুর । তাদের মধ্যে কবির নামের একজন জানায়, তার মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। সে সারাদিন সিটি এলাকার ময়লা আবর্জনা থেকে কাগজ ও প্লাস্টিক কুড়িয়ে ভাঙাড়ির দোকানে বিক্রি করে দুইশ থেকে তিনশত টাকা আয় করে। এরপর বিকেলে রেললাইনে বসে ড্যান্ডি নিয়ে। যেদিন টাকা কম হয় সেদিন গাঁজা সেবন করে বলে জানায় সে।
এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাপ্তাহিক উত্তর কথা পত্রিকার সম্পাদক এডভোকেট মোস্তাক আলম টুলু বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর এ সকল শিশুদের উদ্ধার করে ভাল পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পারে।
এ সকল মাদকাসক্ত শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা না হলে এরা বিপথগামী হয়ে পড়বে। এরা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়লে সমাজ অন্ধকারের পথে চলে যাবে। কাজেই এদের রক্ষার্থে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেওয়ান লালন আহমেদ জানান, শিশু অধিকার আইনে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ খুবই কঠিন। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তর এ সকল মাদকাসক্ত শিশুদের উদ্ধার করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। প্রয়োজনে পুলিশ সমাজসেবা অধিদপ্তরকে সহায়তা করবে।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment