স্ত্রীর পরকীয়ায় নিঃস্ব প্রবাসী আবুল হাশেম

প্রবাস জীবনে ভালোই ছিলেন আবুল হাশেম। একটাই ঘাটতি ছিল তার। সে সময় স্ত্রী-সন্তান ছিল দেশে। তাই মন পড়ে থাকতো তাদের কাছেই। এক সময় সে ঘাটতিও দূর হয়। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে যান নিজের কাছে। সময়টা তার ভালোই কাটছিলো। প্রবাস জীবন। ঘরেই থাকতেন স্ত্রী। সঙ্গে দুই সন্তান। প্রিয়জনদের সময় দিতে তাই কাজও কমিয়ে দিয়েছিলেন হাশেম। দুই বেলা কাজের বদলে স্ত্রী-সন্তানদের সময় দিতে এক বেলায় নামিয়ে আনেন কর্মঘণ্টা। ঠিকঠাকই চলছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।
পরকীয়ায় জড়িয়ে গেলেন প্রিয়তমা স্ত্রী। সুখের সংসারে শুরু হলো ভাঙন। কিন্তু স্ত্রীপ্রেমে এতোই অন্ধ ছিলেন সেদিকে নজরই পড়েনি হাশেমের। নিজের অজান্তেই তছনছ হয়ে গেলো তার সাজানো প্রবাস সংসার। একদিন প্রেমিকের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন স্ত্রী। সঙ্গে নিলেন দুই সন্তানকেও। নিয়ে গেলেন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিলে তিলে জমানো অর্থকড়ি-সহায়-সম্পদ। কিছুই রইলো না তার। স্ত্রী একেবারে নিঃস্ব করে গেলেন হাশেমকে। এ ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। শরীয়তপুর জেলার বাসিন্দা আবুল হাশেম ১৯৯৯ সাল থেকে ইতালিতে বসবাস করে আসছেন। সম্প্রতি তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। এ ব্যাপারে শিগগিরই আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আবুল হাশেমের বড় ভাই আবুল কাশেম।

পুরো ঘটনা উল্লেখ করে, গত ২৪শে জানুয়ারি বিষয়টি অনুসন্ধান করতে ইতালির রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি আবেদন করেন আবুল হাশেম। এতে তিনি নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছেন উল্লেখ করে দুই সন্তানকে ফেরত পেতে আর্জি জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে দূতাবাস হাশেমের আবেদনটি সংযুক্ত করে গত ২৫শে জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে।
রাষ্ট্রদূতের কাছে দেয়া আবেদনে আবুল হাশেম বলেছেন, তিনি ১৯৯৯ সাল থেকে ইতালিতে বৈধভাবে বসবাস করে আসছেন। ২০০৩ সালে বিয়ে করেন। ২০০৬ সালে তাদের প্রথম সন্তান জন্ম নেয়। এরপর ২০০৯ সালে স্ত্রী-সন্তানকে ফ্যামেলি ভিসায় ইতালিতে নিয়ে যান। সেখানে জন্ম নেয় তাদের দ্বিতীয় সন্তান। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে স্থায়ী বসবাস করার জন্য স্ত্রীকে রেসিডেন্স কার্ডের ব্যবস্থা করেন। স্ত্রীর নামে একটি ব্যাংক একাউন্ট খুলে দেন। হাশেম জানান, তিনি ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত একটি রেস্টুরেন্টে বৈধভাবে কাজ করতেন। তখন তিনি দুইবেলা কাজ করতেন। স্ত্রী-সন্তান ইতালিতে যাওয়ার পর তিনি একবেলা কাজ ছেড়ে দেন। বাকি সময় দেন পরিবারকে।
ওই বছরই রেস্টুরেন্টের মালিক তাকে অযৌক্তিভাবে কাজ থেকে অব্যাহতি দেন। তখন তিনি মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেন। সংসার চালানোর জন্য ২০১৪ সালে তিনি ও তার স্ত্রী পরামর্শ করে একটি দোকান দেন। দীর্ঘ ১৮ মাসেও যখন দোকান ঠিকমতো চলছিলো না তখন তিনি ২৫ হাজার ইউরোর বিনিময়ে পজিশনটি একব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করেন। এই অর্থ থেকে কিছু তিনি সংসারে খরচ করেন। বাকি টাকা নিজের ব্যাংক একাউন্ট এবং স্ত্রীর কাছে রাখেন। এছাড়া রেস্টুরেন্ট মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে ২৯ হাজার ৭৫০ ইউরো পান। সে অর্থের পুরোটাই তিনি স্ত্রীর কাছে রাখেন। তাদের পরিকল্পনা ছিলো ওই বছরের ডিসেম্বর অথবা চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্বপরিবারে দেশে ফেরার।
হাশেম জানান, এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার এক যুবক তাদের সঙ্গে সাবলেটে ওঠেন। সে কাজ করতো ওই বাসারই নিচের একটি দোকানে। ওই যুবকই এক সময় কাল হয়ে দাঁড়ায় সাজানো সংসারে। স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন তার সঙ্গে। কিন্তু স্ত্রীকে এতটাই ভালোবাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে, হাশেম ভাবতেই পারেননি তাকে ছেড়ে চলে যাবে। দীর্ঘদিনের সাজানো সংসার মুহূর্তেই ভেঙে তছনছ করে দেবে। হাশেমের মতো তার পরিবারে লোকজনও তার স্ত্রীকে বিশ্বাস করতো, ভালোবাসতো। তাদের সেই ভালোবাসা এবং বিশ্বাসকে উপেক্ষা করেই সে ওই যুবকের হাত ধরে গত বছর ১৫ই অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে চলে যায়। প্রেমিকের সঙ্গে চলে যাওয়ার সময় নিয়ে যায় দুই শিশু সন্তানকেও।
দূতাবাসে লেখা ওই আবেদনে হাশেম জানান, তার স্ত্রী যখন ওই যুবকের হাত ধরে সংসার ছেড়ে চলে যায় তখন জমানো নগদ ১১ হাজার ইউরো, বাড়িভাড়া বাবদ নগদ ১২শ’ ইউরো, ১৫-১৬ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, ৩টি মোবাইল সেট, ১টি আইপ্যাড নিয়ে যায়। এছাড়া তার ব্যাংক একাউন্টে আগে জমা ছিলো নগদ ৩ হাজার ২২১ ইউরো। অর্থাৎ নিয়ে যাওয়া অর্থ সর্বমোট ১৫ হাজার ৪২১ ইউরো।
এছাড়া তার ও স্ত্রীর আলাদা এটিএম কার্ড (ব্যাংকোম্যাট) ছিলো। প্রতিটি কার্ডে আলাদা নাম লিখে মানিব্যাগে রাখতেন। মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সেগুলো নবায়ন করেন। স্ত্রী নবায়নকৃত কার্ড চুরি করে পুরাতনগুলো মানিব্যাগে রেখে দেয়। হাশেম বলেন, এ বিষয়টি প্রথম বুঝতে পারেন, ১৫ই অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে যখন মোবাইলে ব্যাংক থেকে ব্যাংকোম্যাট কার্ড ব্যবহার করে ২ হাজার ইউরো ওঠানো হয়েছে বলে মেসেজ আসে। এরপর তিনি সঙ্গে সঙ্গে মানিব্যাগে থাকা কার্ডগুলো চেক করেন। দেখেন সেগুলো ঠিকই আছে। কিন্তু শনিবার বলে তিনি ওইদিন ব্যাংকে যোগাযোগ করতে পারেননি। ওই সময় তিনি রোমের মন্টি কম্পাট্রি নামে একটি শহরে কাজ করছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করেন। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও বন্ধ পান। তখন তার বাসার এক ব্যক্তিকে ফোন করেন। ওই ব্যক্তি জানায়, তার স্ত্রী এবং দুই বাচ্চা বাসায় নেই। এরপর সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বাসায় ফেরেন। বাসায় ফেরার সময় সাবলেট থাকা যুবকের দোকান বন্ধ পান। বাসায় ফিরে ঘর অগোছালো পান। এরপর ওই বাসায় থাকা সবাইকে এবং আত্মীয়-স্বজনকে বিষয়টি জানান।
এরপর হাশেম দেরি না করে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে যান। তারা ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। এসময়েও তাদের কোন হদিস না পাওয়ায় সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি যখন নিখোঁজ ডায়রি করতে যান তখন তার মোবাইলে একটি মেসেজ আসে। মেসেজ আসে যে, রোম সিটি থেকে ৫৫০ কিলোমিটার দূরে ভেরোনা সিটির উইন্ড রিটেইল দোকান থেকে তার কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা করা হচ্ছে। তখন তিনি স্ত্রী তার প্রেমিকের নামে পালিয়ে যাওয়ার মামলা করেন। পরদিন ভেরোনা সিটির ইউনিক্রেডিট ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে ১ হাজার ৯০০ ইউরো উঠানো হয়েছে জানিয়ে আরো দু’টি মেসেজ আসে। এরপর তিনি দেরি না করে ওই শহরে যান। কিন্তু তিনদিনেও খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। পরে ব্যাংকে যান। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা এটিএম বুথের ভিডিও ফুটেজ দেখে তার স্ত্রী এবং ওই যুবককে শনাক্ত করেছে। সূত্র: মানবজমিন

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment