যমুনায় নাব্যতা সংকট উত্তরের ১৬ জেলায় ডিজেল ঘাটতির আশঙ্কা

পাবনার বাঘাবাড়ির তেল ডিপোগুলোতে জ্বালানি তেল আনা হয় নদীপথে। এখন শুকনো মওসুম। যমুনাতে প্রায়ই সৃষ্টি হয় নাব্যতা সংকট। এতে দেশের উত্তরের ১৬ জেলায় বোরো খেতে পানি সেচের জন্য জ্বালানি তেল সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা করেছেন তেল ব্যবসায়ীরা। তবে বাঘাবাড়ি নৌবন্দরের এক পরিবহন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নদীতে প্রয়োজনীয় ড্রেজিং করা হচ্ছে। তেলের কোনো সংকট বা ঘটতি হবে না।

চলতি বোরো মওসুমে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ৫ লাখ ৯০ হাজার ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র চালাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫ কোটি লিটার ডিজেল প্রয়োজন। বিপিসির বাঘাবাড়ি অয়েল ডিপোর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিনটি কোম্পানির বিপণন কেন্দ্রে আপৎকালীন মজুদ আছে মাত্র পাঁচ কোটি লিটার ডিজেল। ওই মজুদ দিয়ে মাত্র এক মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে বিপিসির এক সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে যমুনা নদীর মারাত্মক নাব্যতা সংকটের কারণে জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সারবোঝাই জাহাজ ও কার্গো ভ্যাসেল সময়মতো বাঘাবাড়ি বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে মাঝে মধ্যেই আপৎকালীন মজুদ থেকে ডিজেল সরবরাহ দিতে হয়। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উত্তরাঞ্চলে ডিজেল সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এ অঞ্চলের তেল পাম্প মালিকরা।

সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি নৌবন্দর ট্রানজিট বাফার গুদাম থেকে সড়কপথে উত্তরাঞ্চলের ১৪টি বাফার গুদামে মজুদের জন্য রাসায়নিক সার পাঠানো হয়। কিন্তু নাব্যতা সংকটে কার্গো জাহাজ পূর্ণ লোড নিয়ে বাঘাবাড়ি বন্দরে আসতে পারছে না। অর্ধেক সার লোড করে সেগুলো বন্দরে আসছে। ফলে বাফার গুদামগুলোতে সময়মতো সার পৌঁছানো যাচ্ছে না বলে বিসিআইসির বাঘাবাড়ি বাফার গুদাম সূত্রে জানা গেছে।

উত্তরাঞ্চলে সর্ববৃহৎ নৌবন্দর বাঘাবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র নৌপথ যমুনা নদীর ১২টি পয়েন্টে মারাত্মক নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। যমুনা নদীতে বালুর প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় নদীর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় চর ও ডুবোচর। ফলে বাঘাবাড়ি বন্দরমুখী জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সার ও বিভিন্ন পণ্যবাহী ভ্যাসেল মাঝে মধ্যেই ডুবোচরে আটকা পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে যেকোনো মুহূর্তে বাঘাবাড়ি বন্দরমুখী জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সার ও বিভিন্ন পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সেচ ও সারনির্ভর বোরো আবাদে উত্তরাঞ্চলে কৃষিসামগ্রীর ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

বাঘাবাড়ি বন্দর সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সার, ক্লিংকার ও পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ চলাচলের জন্য ১১ থেকে ১২ ফুট পানির গভীরতা প্রয়োজন হয় অথচ নৌবন্দরের প্রায় ১৮ কিলোমিটার ভাটিতে বেড়ার মোহনগঞ্জ থেকে দৌলতদিয়া পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এলাকার পেঁচাকোলা, রাকশা, সাফুল্লাসহ ১২টি পয়েন্টে পানির গভীরতা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ছয় থেকে সাত ফুটে।

বিপিসির বাঘাবাড়ি অয়েল ডিপো সূত্রে জানা যায়, বোরো মওসুমে সেচের জন্য (ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত) পাঁচ মাসে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় প্রায় ৪৫ কোটি লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এ অঞ্চলের পাঁচ লাখ ৯০ হাজার ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র চালাতে গড়ে প্রতিদিন ১৮ লাখ লিটার ডিজেল বাঘাবাড়ি অয়েল ডিপোর তিনটি কোম্পানির বিপণন কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা হয়। উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল চাহিদার ৯০ ভাগই সরবরাহ করা হয় বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে। জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ সময়মতো বাঘাবাড়ি বন্দরে পৌঁছাতে না পারলে আপৎকালীন মজুদ থেকে সরবরাহ দেওয়া হয়। এতে মজুদ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

রাজশাহী ও রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মওসুমে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী এই ১৬ জেলায় এবার প্রায় ১৮ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর (এক কোটি ৩৬ লাখ বিঘা) জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ আরিচা অফিসের একটি সূত্রে জানা যায়, রাসায়নিক সার ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য ১০ থেকে ১১ ফুট পানির গভীরতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে এ নৌপথে কোথাও কোথাও ৭ থেকে ৮ ফুট পানির গভীরতা রয়েছে। আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে পানির স্তর কমে ৬ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কামরুন নাহার বলেন, ভারত থেকে আসা ব্রক্ষপুত্র ও তিস্তা নদীর প্রবাহ একসঙ্গে ধারণ করে যমুনা নদী বিশাল জলরাশি নিয়ে বিস্তীর্ণ জনপদের ভেতর দিয়ে প্রবাহমান ছিল। কিন্তু ভারত তিস্তা ও ব্রক্ষপুত্রে নদে বহুসংখ্যক জলবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প নির্মাণ করে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। এদিকে গত কদিন ধরে অপ্রত্যাশিতভাবে তিস্তার পানি প্রবাহ অনেক নিচে নেমে এসেছে। ফলে যমুনা নদীতে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ না বাড়লে যমুনায় নাব্যতা সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে বলে মনে করেন তিনি।

বাঘাবাড়ি-দৌলতদিয়া নৌপথের চ্যানেল পরিদর্শক আনিস সরদার জানান, বর্তমানে যমুনা নদীপথের মোহনগঞ্জ, হরিরামপুর ও নগড়বাড়ী জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া নদীতে ৭ থেকে ৮ ফুট পানির গভীরতা রয়েছে। এ চ্যানেলে অর্ধেক লোড নিয়ে জাহাজ চলাচলে কোনো সমস্যা না থাকলেও পলির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় যেকোনো সময় সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

বাঘাবাড়ি নৌবন্দরের সহকারী পরিচালক ও পরিবহন কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক জানান, এ নৌপথে ড্রেজিং করায় আপাতত নাব্যতা সংকট নিরসন হয়েছে। তবে সংকট দেখা দিলে তা নিরসনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিপিসির বাঘাবাড়ি রিভারাইন অয়েল ডিপোর যমুনা কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজার আব্দুল মজিদ জানান, বাঘাবাড়িতে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিনটি তেল কোম্পানির ডিপোতে পাঁচ কোটি লিটার ডিজেল মজুদ আছে। প্রতিদিন একাধিক জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে বন্দর ডিপোতে ভিড়ছে। জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেল সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই বলে তিনি জানান।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment