অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২৩

সাপ্তাহিক রিপোর্টার-এ কাজ করার সুবাদে মোজাম্মেল ভাই’র সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। এ কারণে তিনি তার নতুন উদ্যোগে আমাকে সম্পৃক্ত করেছেন ১৯৮৮ সালে। একই টিমে নিয়েছেন খোরশেদ আলম, ইকবাল কবীর, রানা আশরাফ, অসীম সুর ও শফিককে। পরে এক সময় সম্পৃক্ত হলেন আজমল হক হেলাল; প্রথমে চিত্র সাংবাদিক, পরে আমার চাপে রিপোর্টার। এ ছাড়া উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত ছিলেন মো. আবুল কাশেম ও তালেবুর রহমান। উপদেষ্টাদের মধ্যে মো. আবুল কাশেম ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী, তার বাড়ি থেকে খুনি ইমদু গ্রেপ্তারের নাটক করেছিলেন সে সময়ের সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ, আরও অনেক নাটকের পর ক্ষমতা দখল করেন রমনী মোহন এরশাদ।

মোজাম্মেল ভাই বললেন, পত্রিকার নাম সুগন্ধা। মালিকের বাড়ি বরিশালের ঝালকাঠিতে। ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার খায়রুলা আনাম প্রায় এক বছর পত্রিকাটি চালিয়েছেন, এ সময় পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে কিন্তু পত্রিকা পাঠক ধরেনি। এজন্য মালিক টিম চেইঞ্জ করেছেন, এখন আমরা চালাবো। অল্প কথায় গৌরচন্দ্রিকা শেষ করে মোজাম্মেল ভাই বললেন, আলম রায়হান এবার আপনি বলেন। এই বলে তিনি আমার দিকে তাকালেন ও পত্রিকার কয়েকটি কপি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। তিনি আমার মতামত চাইলেন। অমি বললাম, এ পত্রিকা চলার কোনো কারণ নেই। পত্রিকার যে সাইজ এবং যে ধরনের আইটেম ছাপা হয়েছে তাতে পাঠক ধরতে এক যুগ লাগতে পারে। আর মালিক প্রথমবার যেহেতু এক বছরে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন তাতে আমরা ছয় মাসের বেশি সময় পাবো বলে মনে হয় না। কাজেই আমাদের হাতে সময় খুব কম, যা কিছু করার ছয় মাসের মধ্যেই করতে হবে।

মোজাম্মেল ভাই খুব মন দিয়ে শুনছিলেন। বললেন, তা হলে কী করা দরকার বলেন। আমি বললাম, ডাবল ডিমাই সাইজে হবে না; ম্যাগাজিন সাইজ করতে হবে, সাপ্তাহিক রিপোর্টার-এর মতো।

: কিন্তু সাপ্তাহিক রিপোর্টারও তো চলেনি!

: পত্রিকা অতি উচ্চ মার্গীয় হবার কারণে চলেনি; আমরা সাধারণ পাঠক ধরার চেষ্টা করবো; বিড়ির মার্কেট ধরার মতো। সিগারেটের চেয়ে বিড়ির ভোক্তা বেশি, পুঁজি কম লাগে; কিন্তু মুনাফা বেশি।

মোজাম্মেল ভাই একমত হলেন। এরপর এলো পত্রিকার মূল্য প্রসঙ্গ। পত্রিকার দাম ছিল তিন টাকা। ইব্রাহিম এ দাম রাখার পক্ষে ছিলেন। আমি বললাম, আগে পত্রিকা না চলার এটিও একটি কারণ। তিন টাকা লেনদেন করা ঝামেলা।

: তা হলে এক টাকা বাড়িয়ে চার টাকা করি?

: আর একটু বাড়ান, পত্রিকার দাম হবে পাঁচ টাকা।

: এতো দাম হলে পাঠক কিনবে?

:  আইটেম থাকলে কিনবে, না থাকলে মাগনা দিলেও নেবে না।

মোজাম্মেল ভাই এ প্রস্তাবও নিলেন, তবে নতুন দাম কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু দিন সময় নিতে চাইলেন কৌশল হিসেবে। সিদ্ধান্ত হলো, পাঠক ধরার পর কোন এক হট ইস্যুতে দাম তিন টাকা থেকে পাঁচ টাকা করা হবে।

শুরু হলো খোন্দকার মোজাম্মেল হকের স্নিগ্ধ নেতৃত্বে সাপ্তাহিক সুগন্ধার দ্বিতীয় ও সফল যাত্রা, তিনি হলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। আমার পদ-পদবি নিয়ে কোনো আলাপ হলো না, আমিও এ প্রসঙ্গ তুলিনি। বরাবরই পদের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধানের ওপর ছেড়ে দিয়ে আসছি। এতে প্রাপ্তিতে বিলম্ব হলেও শেষতক বঞ্চিত হয়েছি বলে মনে হয় না; না চাইতেই যথাযথ পদ পাবার ক্ষেত্রে মাই টিভি সর্বশেষ উদাহরণ।

মোজাম্মেল ভাইর প্রশ্নাতীত নেতৃত্বে শুরু হলো ম্যাগাজিন আকারে সাপ্তাহিক সুগন্ধা প্রকাশের কাজ। একদিনের মধ্যে মোজাম্মেল ভাই বিভিন্ন কাজের জন্য প্রায় বিশ-ত্রিশ জন লোক সম্পৃক্ত করলেন পত্রিকার সঙ্গে। অর্গানাইজ করার এক অদ্ভূত ক্ষমতা আছে মোজাম্মেল ভাই’র। আমাকে দেয়া হলো রাজনৈতিক বিষয়ে খোঁজখবর রাখার দায়িত্ব। যাতে আমি স্বাছন্দ বোধ করি। কিন্তু পর দিনই আমার জন্য অস্বস্তির কাজ দিলের মোজাম্মেল ভাই। বললেন, আলম আরা মিনুর সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি আইটেম করতে হবে। আলম আরা মিনু তখন অখ্যাত এক কিশোরী শিল্পী। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গায়। এমন এক অখ্যাত শিল্পীর অ্যাসাইনমেন্ট কেন আমাকে দেয়া হলো তা আজও আমার কাছে প্রশ্নই থেকে গেছে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করিনি। চুপ থেকে আলম আরা মিনুর ওপর অ্যাসাইনমেন্ট করার কাজ শুরু করলাম।

প্রথমেই আলম আরা মিনুর বাসার ঠিকানা বের করলাম। ফার্মগেট সংলগ্ন রাজাবাজার এলাকায় পরিবারে থাকতো সে। বেকার বাবার সংসারে চরম দারিদ্রে ছিলো তার জীবনে। এর মধ্যে তার এক বোনের পিঠে ছিল কুজ। দিনের বেলায়ই প্রায় অন্ধকার ঘরে বসে নানান কথা শুনলাম আলম আরা মিনুর, তার জীবনের গল্প। যার বেশির ভাগই নানান ক্লেদে ভরা। মোজাম্মেল ভাই এ অ্যাসাইনমেন্ট না দিলে আমার অজানাই থেকে যেতো, অনেক শিল্পীর বেড়ে ওঠার পেছনে কী কষ্ট আর গঞ্জনার কাহিনী থাকে!

১৯৮৮ সালের ২-৮ জুন প্রকাশিত হলো মোজাম্মেল ভাইর নেতৃত্বে সাপ্তাহিক সুগন্ধার প্রথম সংখ্যা। এতে সখ্যায় প্রকাশিত হয় সাক্ষাৎকারভিত্তিক আলম আরা মিনুর ওপর আমার আইটেম।

সুগন্ধা থেকেই উদ্ধৃত করা যাক, ‘১৯৮৬ সালের এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত আলম আরা মিনু বিভিন্ন সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় সাতটি স্বর্ণপদক লাভ করেছে। ৮২ সাল থেকে সে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ষোল বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এ সময় সে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন সঙ্গীতের প্রতিযেগিতায় সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চ্যাম্পিয়নশিপ পুরস্কারসহ মোট ১১৮টি প্রশংসাপত্র লাভ করেছে। সে কয়েকটি চলচ্চিত্রেও কণ্ঠদান করেছে। রেডিও এবং টেলিভিশনের অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছে। গত ১২ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে একক সঙ্গীত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের গান পরিবেশন করে মিনু শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে।”

আলম আরা মিনুর এই যে সাফল্য তা কেবল তার ইচ্ছার ফল।  সুগন্ধা থেকেই উদ্ধৃত করা যাক, “শিশু অবস্থায় সে শোনা গান চিৎকার করে গাইতো। মুগ্ধ হয়ে গান শুনতো। তার এ আগ্রহ বাবা মো. ইয়াকুব আলী মিঞা লক্ষ্য করেছেন শুরুতেই। তাই মেয়ের আগ্রহের ব্যাপারে যত্নবান হন। কিন্তু ৮১ সালে আলম আরা মিনুর সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় একেবারেই অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। তখন তারা চট্টগ্রামে থাকতো। চট্টগ্রামের অনলী নন্দী তাকে সর্বপ্রথম গান শেখাবার দায়িত্ব নেন। কিন্তু কণ্ঠশিল্পী হিসেবে অনীল নন্দীর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। তবে সে ভালো তবলচি ছিল। তার কাছেই আলম আরা মিনু বছর খানেক গান শেখে। মিনু এর পর রাখাল নন্দীর কাছে গান শেখা শুরু করে। এটাই তার প্রাতিষ্ঠানিক গান শেখার সূচনা। ৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিনুরা ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় আসার পর সে একটি সঙ্গীত বিদ্যালয়ে ৬/৭ মাস গান শেখে। তার পর থেকে সে ওস্তাদ সঞ্জয় কুমার দের কাছে সঙ্গীতের পাঠ নিচ্ছে। সে রেওয়াজ করে নিয়মিত।”

আলম আরা মিনুর দুর্ভাগ্যের এখানেই শেষ নয়। সুগন্ধা থেকেই উদ্ধৃত করা যাক, “এক সময় স্বচ্ছল পিতা মোঃ ইয়াকুব আলী বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে বিগত পাঁচ বছর ধরে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ। ফলে ৭ সদস্যের পরিবার আলম আরা মিনুর উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। উপার্জনের উৎস বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে প্রাওয়া সম্মানী।”

কিন্তু এ ক্ষেত্রেও আছে নানান তিক্ততা। সুগন্ধা থেকেই উদ্ধৃত করা যাক, “৮৬ সালে টাঙ্গাইলে একটি অনুষ্ঠানে অন্যান্য শিল্পীদের সাথে সারারাত সঙ্গীত পরিবেশন করে মিনুকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। এ ঘটনা শুধু মফস্বল শহরের অঁজপাড়ায় ঘটেছে, তা নয়। খোদ রাজধানীতেও এমন অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরে বিসিআইসি, মিলনায়তনে পৃথক পৃথক ভাবে রাষ্ট্রপতি এইচ এম এম এরশাদ ও  পৌর প্রশাসক কর্নেল এম এ মালেকের সমম্বর্ধনায় গান গেয়ে আলম আরা মিনু কোন পারিশ্রমিক পায়নি। অথচ এই দুই ক্ষেত্রে তার প্রত্যাশা ছিলো বেশি।”

শুধু তিক্ততা নয়। সুখের অনুভূতিও আছে তার। সুগন্ধা থেকেই উদ্ধৃত করা যাক, “মহানগর জাতীয় পার্টির অফিসে বেগম মমতা ওহাবের এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে মিনু সঙ্গীত পরিবেশন করে। গানে মুগ্ধ হয়ে বেগম মমতা ওহাব মাতৃস্নেহে মিনুকে জড়িয়ে ধরেন এবং নিজ থেকে দুই হাজার টাকা উপহার দেন।”

আলাম আরা মিনুকে নিয়ে আমার স্টোরির শেষ অনুচ্ছেদ ছিলো, “কথা প্রসঙ্গে আলম আরা মিনু উল্লেখ করেছে, সিনিয়রদের মধ্যে কেউ অপ্রত্যাশিত আচরণ করে। তবে সে বিশ্বাস করে, যত প্রতিবন্ধকতাই থাক তার প্রতিভার যভাযথ মূল্যায়ন হবেই। সে নিজের ব্যাপারে অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ী।”

সাপ্তাহিক সুগন্ধার জন্য অইটেম করতে গিয়ে ১৯৮৮ সালে আলম আরা মিনু সম্পর্কে আমার যে মূল্যায়ন ছিল তা পরবর্তী সময়ে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। অবশ্য এজন্য তাকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। যা প্রদীপের নিচের অন্ধকার হিসেবেই থেকে গেছে। যে অন্ধকার অন্যকে স্পর্শ করে না, কিন্তু প্রদীপকে বড় বেশি কষ্ট দেয়। আলম আরা মিনু এমনই এক প্রদীপ। যার বেলায় এক বাক্যে বলা চলে- জম্ম থেকে জ্বলছি!

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক ভয়েস বাংলা

ছবি: ১৯৮৮ সালে ২ জুন প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুগন্ধার প্রচ্ছদ। সুগন্ধার সঙ্গে কিশোরী আলম আরা মিনু

আরো সংবাদ
Please follow and like us:

Related posts