অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২৪

সুগন্ধা প্রথম সংখ্যায় আমার তিনটি আইটেম ছিলো। তবে কেবল আলম আরা মিনুর আইটেমে নাম দিয়ে ছিলাম। আমার মনে হয়েছিলো, একদিন এ কিশোরী সব কিছু ছাপিয়ে কেবলমাত্র মনের জোরে প্রতিষ্ঠা পাবে। পরর্র্তীতে হয়েছেও তাই। তবে তার প্রতিষ্ঠা খুব বেশি উজ্জ্বল বলে মনে হয় না। আর শেষতক যতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তার নেপথ্যেও রয়েছে তার বৈবাহিক জীবনে আপোষ। আলম আরা মিনুর উদাহরণ থেকে চাইলে হয়তো একটি প্রবচনের মতো চালু করা যায়, গোবরে পদ্ম ফুল ফুটলেও সব সময় ততটা উজ্জ্বল হয় না; ঘাটতি থাকে সুঘ্রাণেও। কি কারণেই যেনো অন্য গুরুত্বপূর্ণ আইটেম বাদ দিয়ে আলম আরা মিনুর আইটেমে নাম দিয়েছিলাম; হয়তো এ ছিলো এক কিশোরীর প্রতি এক যুবকের অন্য রকম অনভূতির প্রভাব। তবে মিনুকে নিয়ে আইটেম ছাপা হলেও শেষতক তাতে আমার নাম থাকেনি। এর অর্থ এই নয় যে, মোজাম্মেল ভাই কেটে দিয়েছিলেন। নাম দেবার আগ্রহ যেমন ছিলো আমার, তেমনই মরিয়া হয়ে আমিই বাদ দিয়েছি। এ জন্য অবশ্য পেস্টার প্রদীপকে ভেট হিসেবে কোক খাওয়াতে হয়েছে।

মোজাম্মেল ভাই’র নেতৃত্বে ম্যাগাজিন আকারে সাপ্তাহিক সুগন্ধা প্রকাশের সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ছাপার জন্য প্রেসে পাঠাবার আগে শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে।  পেস্টিং শেষের পথে, পৃষ্ঠা সাজানোর কাজ চলছিলো। সকলেই ব্যস্ত এবং এক রকম আনন্দের আবেগে আপ্লুত। এ সময় প্রিন্টার্স লাইনের পেজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, চিফ রিপোর্টার হিসবে আমার নাম রয়েছে। এ বিষয়ে মোজাম্মেল ভাই আমার সঙ্গে কোন আলাপ করেননি। তার নিজের বিবেচনায়ই তিনি পদ নির্বাচন করেছেন; বেতনও নির্ধারণ করেছেন তার বিবেচনায়।

প্রিন্টার্স লাইন দেখে খুশিই হয়েছিলাম, মেঘ না চাইতেই নির্মেন্দু গুনের কবিতার ‘বরফ মাখা জল’ পাবার মতো। কিন্তু এ সময় অন্য ঝামেলায় পড়লাম আলম আরা মিনুকে নিয়ে। কারণ, আর যাই হোক কিশোরী শিল্পীর আইটেমে তো চিফ রিপোর্টারের নাম যেতে পারে না, চিফ রিপোর্টারের মানইজ্জত বলে একটা কথা আছে! এ বিবেচনায় পেস্টার প্রদীপকে বললাম, ট্রেসিং থেকে আমার নাম বাদ দিতে। এর কারণও বললাম তাকে। কিন্তু প্রদীপ আমাকে পেয়ে বসলো। সে অস্বীকার করলো। বললো, মোজাম্মেল ভাইকে বলেন, না হয় আমাকে ভরপেট কোক খাওয়াতে হবে; তা না হলে পারবো না! এই বলে সে হাসতে থাকলো। আমি পড়লাম মহা ফাপরে। কারণ, মোজাম্মেল ভাইর কাছে গেলে সেটি একরকম বিব্রতকর অবস্থা হতে পারে। এর চেয়ে পেস্টারকে ঘুষ হিসেবে কোক খাওয়ানো ভালো, তাই করলাম। তবে তাকে একা না, সবাইকে খাইয়েছিলাম সেলিব্রেট করার অংশ হিসেবে। পত্রিকা ছাপার পর বিব্রতকর বিষয়টি নিয়ে মোজাম্মেল ভাইর সঙ্গে আলাপ করলাম  কৈফিয়ত দেবার মতো। তিনি বললেন, সাপ্তাহিক রিপোর্টার-এ আপনাকে চিফ রিপোর্টার করার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। কিন্তু পত্রিকাইতো টিকলো না, তাই সুগন্ধায় করলাম।

সুগন্ধার আগে সাপ্তাহিক জনকথা, সাপ্তাহিক ঝরণা, সাপ্তাহিক জনতার ডাক, সাপ্তাহিক রিপোর্টার, সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ ও সাপ্তাহিক ফসলে কাজের মাধ্যমে রিপোর্টার  হিসেবে মোটামুটি দক্ষতা অর্জিত হলেও পাঠকদের মধ্যে মূল ফোকাস শুরু হয় সুগন্ধার মাধ্যমে। আবার নেতৃত্বেরও সূচনা হয় সুগন্ধার মাধ্যমে। বছর খানেকের মধ্যে মোজাম্মেল ভাই দলবল নিয়ে সুগন্ধা ছেড়ে চলে যাবার ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাতে অপ্রত্যাশিত চাপে পড়েন মালিক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইন। আর এ চাপ তিনি ডাইভার্ড করে দেন আমার ওপর। এ সময় তিনি বললেন, আলম রায়হান পত্রিকা আপনার; আমি আর কিছু জানি না। অথচ প্রায় পাঁচ বছর পর যখন মোয়াজ্জেম সাহেবের মনে হলো, আমাকে না রাখলেও তার পত্রিকা চলবে তখন তিনি অঘোষিত ভাবে উল্টোপথে হাটা শুরু করলেন কাছিমের গতিতে। তার চারদিকে অধিকতর পরিচিত কতিপয় নামকরা সাংবাদিকও জড়ো করলেন; যাদেরকে আমিই সুগন্ধায় সংযুক্ত করেছিলাম। মালিকদের এই এক বিশেষ।  প্রায় একই রকম সুবিধা নিয়েছেন মাই টিভির মালিকও। তবে পার্থক্য হচ্ছে, সুগন্ধার মালিক প্রয়োজন শেষে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমাকে বাদ দিয়েছেন। কিন্তু মাই টিভির মালিক আমাকে বাদ দিয়েছেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো হঠাৎ, ২৬ ফেব্রুয়ারি ভরদুপুরে!

অবশ্য আখেরে সুগন্ধা মালিকের মকসুদ পূরণ হয়নি। আমার পবিরর্তে যাদেরকে নিয়ে তিনি কল্পনার ফানুষ তৈরি করেছিলেন তাদের সঙ্গে সৈয়দ মোয়াজ্জেমের শেষতম সমঝোতা হয়নি, তারা কেউ লোড নিতে চাননি। অবশেষে আমার টিমে সবচেয়ে স্বল্প মেধার ও খন্দকার মোশতাকের মতো চতুর এক সাংবাদিককে করা হলো পত্রিকার ইনচার্জ। তবে নিয়ন্ত্র নিয়ে নিলেন মালিক নিজেন হাতে। ফলাফল, ঊর্ধ্ব গগণে থাকা সাপ্তাহিক সুগন্ধা এক বছরের মধ্যে জমিনের কাদায় লুটোপুটি খেলো। পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলো, এক পর্যায়ে পত্রিকার  মালিকানাই ছেড়ে দিতে হলো সৈয়দ মোয়াজ্জম হুসাইেনকে।

মোজাম্মেল ভাই সকলকে নিয়ে হঠাৎ চলে গিয়ে সাপ্তাতিক সূর্যোদয় প্রকাশ করার পর সুগন্ধায় আমাকে চিফ রিপোর্টার থেকে করা হয় নির্বাহী সম্পাদক; বেতন বৃদ্ধি করা হলো পাঁচ হাজার টাকা। আমি পড়লাম প্রস্তুতিহীন এক মহা চাপে। অবশ্য এ চাপের মাধ্যমে এক ধরনের নেতৃত্বের দক্ষতা সৃষ্টি হয়। এ হচ্ছে দুর্ঘটনার সুফল। আদিম যুগে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে হানাহানির মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতায় ইতিবাচক সূচনা হবার মতো। স্বাভাবিক পথে এগুলো নেতৃত্বের অবস্থানে পৌছতে অনেক সময় লাগতো, অথবা হতোই না; চিরকাল রিপোর্টারের ক্যাপাসিটিতেই থাকতে হতে হয়তো। যেমনাটি হয়েছে নাজিম উদ্দিন মোস্তান ও আশরাফ খানসহ অনেক সাংবাদিকের বেলায়।

কাউকে নীরবে সম্মানিত করা ছিলো মোজাম্মেল ভাইর স্টাইল। দুই মাসের মধ্যে তিনি সকলের বেতন বাড়িয়ে দিলেন। আমার বেতন বেড়ে দাঁড়ালো সাত হাজার টাকা। শুধু সুযোগ সুবিধার দিকে নজর  রাখা নয়, ব্যবহারেও মোজাম্মেল ভাই ইউনিক। সুগন্ধায় তার সঙ্গে প্রায় এক বছর কাজ করেছি। কিন্তু কখনও তাকে রাগ করতে দেখিনি, কোন রকম বকা দেয়া তো অনেক দূরের বিষয়। আইটেম দিতে দেরী হলে বড় জোর বলতেন, না আলম রায়হান; আপনি ডুবাবেন! এ সময়ও তার মুখে হাসি থাকতো। কেবল একবারই হাসিহীন তার কঠিন চেহারা দেখেছি; সে প্রসঙ্গ আসবো পরে।

শুরু থেকেই মোজাম্মেল ভাই সাপ্তাহিক রিপোর্টারকে মডেল হিসেবে বিবেচনায় রেখে এগিয়েছেন। নতুন সংযোজন ছিলো, সিনেমার সংবাদের আধিক্য। সিনে সাংবাদিকতার প্রতি মোজাম্মেল ভাইর আগে থেকেই বিশেষ আগ্রহ ছিলো। এ ধারায় সুগন্ধার সঙ্গে উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হন সিনেমা পরিচালক দেওয়ান নজরুল। এর ফলে সুগন্ধায় সিনেমা সংক্রান্ত খবরের আধিক্য ছিলো। এর সঙ্গে যুক্ত হলো দু’এক জন জ্যোতিষও। এরা সকলেই সুগন্ধায় মোজাম্মেল ভাইর টিমে শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন। কিন্তু শেষতক সুগন্ধার সঙ্গে থাকেননি আবুল কাশেম। তিনি কাছাকাছি দিলকুশায় নিজের একটি অফিস খোলেন। তার সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতে আসা শাহ শিরিন শীলা। তবে শীলা বেশি দিন আবুল কাশেমের সঙ্গে থাকেননি। কিছু দিন পর দেখা গেলো তিনি বিটিভিতে খবর পড়ছেন। এর কিছু দিন পর তিনি অভিজাত এলাকা বারিধারায় বসবাস শুরু করলেন নিজের বাড়িতে। তবে এ ক্ষেত্রে তাকে বিয়ে করতে হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী বয়সী এক ধনবান ব্যক্তিকে। একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগে সাধারণ কাজ করতে এসে  ধনে-মানে-ইজ্জতে প্রতিষ্ঠিত হবার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শাহ শিরিন শীলা। তিনি প্রমাণ করেছেন, মেধা ও অন্য কৌশল জানা থাকলে কঠিন সময় পিছনে ফেলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া তেমন কঠিন কাজ নয়। আর অসাধ্য সাধনের সফল ব্যক্তি হিসেবে গবেষণার উপজীব্য হতে পারেন শাহ শিরিন শীলা। অবশ্য এরকম প্রতিষ্ঠা পাবার উদাহরণ সম্প্রতিক সময়ে অনেক সৃষ্টি হয়েছে।

সাপ্তাহিক সুগন্ধার প্রায় সব কিছু ছিলো সাপ্তাহিক রিপোর্টারের মতো। কেবল মাত্রার হেরফের করা হয়েছিলো। এ ক্ষেত্রে কলাম ও ছোট আইটেম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। এর সঙ্গে যুক্ত করা হলো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ। প্রতি সংখ্যায় নেতাদের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করার দায়িত্ব ছিলো আমার। এর উপর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচ্ছদ রিপোর্টও তৈরি করতাম আমি। তবে সব কিছুই হতো মোজাম্মেল ভাই’র ব্রিফ অনুসারে। কোন বিষয়ে ব্রিফ করার অদ্ভূত ক্ষমতা ছিলো তার; তিনি ব্রিফ করতেন নাটকীয় ভঙ্গিতে।

সাপ্তাহিক রিপোর্টার-এর মতো একটি বিশেষ ধরনের কলামও রাখলেন মোজাম্মেল ভাই। সাপ্তাহিক রিপোর্টারে মায়ের চিঠি নামে এরশাদ মজুমদার একটি কলাম লিখতেন। গ্রাম থেকে একজন বিদুষী মা রাজধানীতে তার ছেলের কাছে চিঠি লিখতেন। এ চিঠিতে নানান বিষয় উঠে আসতো। এতে মা তার ছেলেকে সম্বোধন করতেন ‘শ্রীমান বড় মিয়া’ বলে; শেষ করতেন ‘ইতি তোমার মা’ বলে।  এটি কিছুটা পাল্টে সুগন্ধায় হয়ে গেলো, গেদুচাচার খোলা চিঠি। এতে তখনকার রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদকে সম্বোধন করা হতো মাননীয় প্রেসিডেন্ট এরশাদ চাচা বলে। শেষ করা হতো, ‘অধম নাখান্দা  নালায়েক গেদুচাচা’ বলে।  রিপোর্টারে এরশাদ মজুমদাদের লেখায় কেবল মায়ের বয়ানীতেই নানান বিষয় তুলে ধরা হতো। কিন্তু  সুগন্ধায় গেদুচাচার চিঠিতে আঞ্চলিক ভাষায় নানান বিষয় তুলে ধরার পাশাপাশি সারাদেশ থেকে আসা বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের নানান সমস্যা ও অভিযোগ সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হতো স্বল্প শিক্ষিত এক বয়স্ক চাচার বয়ানীতে। সারাদেশের সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা থাকায় দ্রুত এ চিঠি সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায়। আর এ চিঠির নামেই পরিচিত হলো সাপ্তাহিক সুগন্ধা; পত্রিকাটি দ্রুত পাঠক ধরার কারণও ছিলো এ গেদুচাচার খোলা চিঠি। অল্প সময়ের মধ্যেই গেদুচাচার খোলা চিঠি আর সাপ্তাহিক সুগন্ধা হয়ে গেলো সমার্থক।

 

আলম রায়হান  : নির্বাহী সম্পাদক ভয়েস বাংলা

 

 

আরো সংবাদ 
Please follow and like us:

Related posts