থামছেই না বাল্যবিয়ে » শিবগঞ্জে এক মাসে অর্ধশতাধিক বাল্যবিয়ে বন্ধ : জেল জরিমানা

যেখানেই বাল্য বিয়ের অভিযোগ, সেখানেই সাঁড়াশি অভিযান। বাল্য বিয়ের প্রমাণ মিললেই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা।
শাস্তি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বর-কনের বাবা-মা, চাচা-চাচী, ভাই-ভাবী, বোন-দুলাভাই থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কেউই। বাল্য বিয়ে বন্ধে এভাবেই এক নজিরবিহীন অভিযান চালাচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শফিকুল ইসলাম। গত এক মাসে অর্ধশতাধিক বাল্য বিয়ে বন্ধ করাসহ অন্তত ৪০ জনকে জেল-জরিমানা করেছেন তিনি। গত ১৩-১০-১৬ তারিখ শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম। এরপর থেকেই বাল্য বিয়ে বন্ধে সচেষ্ট হন তিনি। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বাল্য বিয়ে নিয়ে আলোচনা সভা করেন।

সভায় তিনি বলেন – বাল্য বিয়ে সমাজকে পিছিয়ে দিচ্ছে, বাল্য বিয়ের কারণে একজন কিশোরী অল্প বয়সে মা হচ্ছেন। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে সেই কিশোরী। তিনি আরও বলেন – তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাই বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। বসে থাকবে না উপজেলা প্রশাসনও। গত ৯ ফেব্রুয়ারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে নিজ অফিস কক্ষে এক সভায় পৌর ও উপজেলাসহ ১৫ ইউনিয়নের ১৮ জন কাজি এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সচিবগণকে নিয়ে বাল্য বিয়ে রোধে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। সভায় অংশ গ্রহণকারীরাও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এরপর থেকেই শুরু উপজেলার যেখান থেকেই বাল্য বিয়ের অভিযোগ আসে, সেখানেই তাৎক্ষনিকভাবে ছুটে যান তিনি। আর প্রমাণ মিললেই অভিযুক্তদের ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানার শাস্তি দেয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের চলমান এই অভিযানের কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বাল্য বিয়ের সঙ্গে যুক্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার ও বর-কনের অভিভাবকদের মাঝে। গত ১ মার্চ শিবগঞ্জের জমিনপুর গ্রামে ৮ম শ্রেনীর এক ছাত্রীর বাল্য বিয়ের আয়োজন করায় কনের চাচা ও দাদাকে একমাসের কারাদন্ড দেয়া হয়।

এছাড়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারী শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নে ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রীর বিয়ে দেয়ার সময় সেখানে অভিযান চালান ইউএনও শফিকুল ইসলাম। তিনি এই বিয়ে বন্ধের পাশাপাশি বর ও বরের দুলাভাইকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ১৫ দিনের কারাদন্ড প্রদান করেন। এই ঘটনার ২২ ফেব্রুয়ারী রাতে উপজেলার পারঘোড়াপাখিয়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনির এক ছাত্রীর বিয়ের আয়োজন করায় কনের মা তাসলিমা বেগম ও চাচা সেমাজুল ইসলামকে এক মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়। এছাড়া গত ২০ ফেব্রুয়ারী শিবগঞ্জের চাতরা ফাজিল মাদ্রাসার ১৪ বছর বয়সী এক ছাত্রীর বাল্য বিয়ের দায়ে বর আব্দুল আলিম ও বরের ভাবি শিউলি বেগমকে দেয়া হয় ১৫ দিন করে কারাদন্ড।

এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারী এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ ৬ ছাত্রীকে বাল্য বিয়ের হাত থেকে রক্ষা করে উপজেলা প্রশাসন। এসব বাল্য বিয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ১০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। এভাবেই গত এক মাসে শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক বাল্য বিয়ে বন্ধসহ অন্তত ৩০ জনকে জেল-জরিমানা করেছেন তিনি। বাল্য বিয়ের আয়োজন করলেই শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে অভিযুক্তদের। রেহাই পাচ্ছেননা বর-কনের বাবা-মা, দাদা-দাদী, চাচা-চাচী, ভাই-ভাবী, বোন-দুলাভাই থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কেউই। গত ৬ মার্চ প্রশাসনকে ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে এফিডেভিটের মাধ্যমে বয়স বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বাল্য বিয়ের আয়োজন করায় শিবগঞ্জ পৌর এলাকার দেওয়ান জাইগীর গ্রামের মোস্তফার কন্যা দশম শ্রেণির ছাত্রীর বাল্য বিয়ে বন্ধ করে দেয়। সেই সাথে কন্যার পিতা মোস্তফাকে বাল্য বিয়ের দায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। সর্বশেষ ১০ মার্চ মনাকষা ইউনিয়নের সাতরশিয়া গ্রামের কনে মোসা. মাকসুদা খাতুনের পিতা আবদুস সামাদ ও কনের মামা হুমায়ন কবির, নয়ালাভাঙা ইউনিয়নের কমলাকান্তপুর গ্রামের বর গোলাম আজম ও ঢোড়বোনা গ্রামের বর মুক্তার হোসেনকে বাল্য বিয়ের দায়ে সাতদিন করে বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয় ভ্রাম্যমান আদালত।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইউএনও মোঃ শফিকুল ইসলাম সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, একাধিকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও যারা বাল্য বিয়ের আয়োজন করছেন, তাদেরই প্রচলিত আইনে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। উপজেলাকে বাল্য বিয়ে মুক্ত করতে প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment