যত্রতত্র স্বাস্থ্য সেবার ব্যবসা

ফারুক আহমেদ চৌধুরী

চাঁপাইনবাবগঞ্জে যত্রতত্র গড়ে উঠছে ক্লিনিক আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে নুন্যতম যোগ্যতা নেই এমন অনেকেই এখন এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ছাড়াই চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা নামসর্বস্ব এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়- চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২১টি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও ৪৭টি ক্লিনিক রয়েছে। তবে ডেন্টাল ক্লিনিকের কোন তথ্য দিতে পারেনি সিভিল সার্জন অফিস। জেলায় বেসরকারি চিকিৎসার নামে এসব প্রতিষ্ঠানে এক ধরনের দৃশ্যমান নৈরাজ্য চলছে। প্যাথলজি পরীক্ষার রেট নির্ধারণ করা থাকলেও মানছে কোন প্রতিষ্ঠান। যে হাসপাতাল যেমন পারছে তেমনি টাকা আদায় করছে। অপারেশনেরও নেই কোন নির্দিষ্ট ফি। একই অপারেশনে, একেক হাসপাতালে একেক রকম ফি নিচ্ছে। পাশাপাশি অপারেশন থিয়েটারগুলোর অবস্থাও খুবই বেহাল। আর বহু বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে বিভাগীয় শহর রাজশাহীর হাসপাতালগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোন প্যাথলজির রিপোর্ট গ্রহণ করে না। ফলে চিকিৎসা করাতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে রোগীদের। নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে হচ্ছে অর্থের অপচয় ।

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিচালনার জন্য ১৯৮২ সালের ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন)অধ্যাদেশ অনুযায়ী শুধু মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি এ তিন রোগের চিকিৎসা বিধান রয়েছে। ওই অধ্যাদেশ অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালগুলো হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারসহ বিশেষায়িত চিকিৎসার পাশাপাশি জটিল কোনো রোগের চিকিৎসা দিতে পারবে না।

মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ এবং ডেন্টাল রোগের চিকিৎসাও দেওয়া যাবে না। কিন্তু বছরের পর বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল-ক্লিনিকে বিশেষায়িত রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ল্যাব ওয়ান মেডিকেল সার্ভিসেস, শাপলা ক্লিনিকের মতো বড় বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ডেন্টাল ইউনিট। পাশাপাশি বেসসরকারিভাবে গড়ে ওঠছে শতাধিক ডেন্টাল চিকিৎসা কেন্দ্র। আর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালীদের কালো ছায়া।
বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর অনিয়ম চরমে উঠেছে। পুরো ব্যবস্থায় এখন চলছে মালিক, চিকিৎসকের স্বেচ্ছাচার ও চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারণা। স্বাস্থ্যসেবা এখন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে জেলার স্বাস্থ্যসেবা। এসব হাসপাতালে নেই বিদ্যমান আইনের কোনো প্রয়োগ। মালিক, চিকিৎসকদের ইচ্ছাই স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনার আইন। তারা ‘মেডিকেল প্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন), অধ্যাদেশ ১৯৮২’ না মেনে রোগীদের থেকে ইচ্ছামতো ফি আদায় করছেন। অথচ রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
সেবার নামে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিক অর্থ আদায়, প্রতারণা, ভুল চিকিৎসা এবং জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। চিকিৎসা ফি, বেড ও কেবিন ভাড়া, অপারেশন, প্যাথলজি টেস্টের ফি ইত্যাদিও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই নির্ধারণ করছে। নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনা খরচের নামে তারা চিকিৎসার খরচ বাড়াচ্ছেন। তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে জিম্মি রোগীরা। সরকারি নীতিমালার তুলনায় ফি কোথাও কোথাও শতগুণ বেশি। তাদের ব্যবসায়িক নির্মম মানসিকতার বলি হয়ে অনেকে ভুল চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন।

সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। এঘটনায় বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশের পর ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সিভিল সার্জন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচএ) ডাঃ আব্দুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের তৎকালিন আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও), ডাঃ সফিকুল ইসলাম, গাইনী এন্ড অবস্ কনসাল্টেন্ট ডাঃ সালমা আক্তার জাহান (পলি), কনসাল্টেন্ট (সার্জারী) ডাঃ শহীদুল ইসলাম খান কে এঘটনা তদন্তের দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়। ল্যাব ওয়ান কর্তৃপক্ষ মৃত পরিবারের সাথে ১ লক্ষ টাকায় সমাধান করে বহাল তবিয়তে অভিযুক্ত ক্লিনিকটি। তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে শেয়ার বিজ কে কোন তথ্য দিতে পারেনি সিভিল সার্জন।

ইতিমধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়গনষ্টিক সেন্টারে অভিযান চালায়। অব্যবস্থাপনার কারনে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। এসব অভিযানে আদালত দেখেছেন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। অথচ এটি খুবই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে আসা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ র‌্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি একেএম এনামুল করিমের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল চলতি বছরের ১৮ই জানুয়ারি জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ক্লিনিক ও ফার্মেসীতে অভিযান চালায়। এসময় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ক্লিনিক পরিচালনা করার অপরাধে সেবা ক্লিনিককে ৩ লাখ, ল্যাবওয়ান মেডিক্যাল সার্ভিসকে দেড় লাখ এবং পদ্মা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার মনিটরিং, সুপারভিশন ও আন্তরিকতার অভাবকে দ্বায়ী করছেন সচেতন মহল। যথাযথভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নীতিমালা বাস্তবায়নে গুরুত্ব আরোপ জরুরী বলে মনে করছেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. সৈয়দ শাহাজামাল। তিনি জানান- জনগণের অর্থে পরিচালিত মেডিকেল কলেজে পড়ালেখা করে বেসরকারী হাসপাতাল গড়ে তুলছেন ডাক্তাররা। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে বসে ইচ্ছেমত ভিজিট নিচ্ছেন। প্রজাতন্ত্রের টাকায় পড়ালেখা করা ডাক্তারদের মানবিক দিকটাও বিবেচনা করা উচিত। সিভিল সার্জন ডাঃ কাজী শামীম হোসেন জানান- এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন দেন ডিজি অফিস, মহাখালী, ঢাকা। আমরা মনিটরিং করে থাকি। নীতিমালা বা আইন আমার জানা নাই।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment