ভারতীয় মাদকে অন্ধকার বাংলাদেশ

তারেক আজিজঃ  দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় মাদকের আগ্রাসী থাবায় অন্ধকারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সহ পুরো বাংলাদেশ। ভারতীয় মাদকের প্রভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার পরিবার ধ্বংসের মুখে পড়ছে। নানান ধরণের মাদকের ছোবলে স্কুল জীবন থেকে ঝড়ে পড়ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। মাদকের প্রভাবে জন্ম নিচ্ছে চুরি ছিনতাই ডাকাতির মত রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ। মাদক আর অপরাধ নিয়ন্ত্রনে ঘুম হারাম পুলিশ প্রশাসনের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদক পাচারকারীরা এখন সীমান্ত এলাকাকেই বেছে নিচ্ছে। গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, পেথিড্রিনসহ মাদকের বড় বড় চালান পারাপারে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম সীমান্ত। ফলে কুচবিহার, মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত দিয়ে কিছু চক্র ভারতীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। স্রোতের মত বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য প্রবেশ করায় নিয়ন্ত্রনে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। সীমান্তে সীমান্তে বিজিবি, থানায় থানায় পুলিশ ছাড়াও র‌্যাব আর মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের সদস্যরা মাদক দ্রব্য আটকের জন্য ঘুম হারাম করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। জানা যায় ভারতের আনাচে কানাচে গড়ে উঠছে ফেন্সিডিল কারখানা। বাংলাদেশে কোটি কোটি টাকার মাদকদ্রব্য আটক হলেও ভারতে মাদকদ্রব্য আটকের ব্যপারে কোন পদক্ষেপ নেই। ভারতের একাধিক বহুল প্রচারিত গণমাধ্যমেও নেই মাদকদ্রব্য আটকের কোন খবর। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার মাদক বিরোধী প্রচার প্রচারনায় ব্যয় করছেন কোটি কোটি টাকা।

রাজধানী ঢাকা সহ বিভাগীয় শহরগুলোতে বর্তমানে স্কুলের অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করছে বিশেষ সিন্ডিকেট। ইয়াবা সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশলে স্কুলে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের বয়স অল্প হওয়ায় অতি সহজে তারা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ভয়াবহ এ নেশা ছড়িয়ে পড়ছে দেশব্যাপী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম) পদকপ্রাপ্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ সুপার টি.এম মোজাহিদুল ইসলাম বলেন এবারের পুলিশ সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্যই ছিল ‘জঙ্গি-মাদকের প্রতিকার, বাংলাদেশ পুলিশের অঙ্গীকার’। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার মাদক বিরোধী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। মাদক পাচারের সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য সবার্ত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও তিনি বলেন- আইন দিয়ে দেশকে মাদকমুক্ত করা যায় না। তাই সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি। যার প্রচেষ্টায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সচেতন এলাকাবাসীদের নিয়ে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হচ্ছে। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়াতে যে কোন চ্যলেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত বাংলাদেশ পুলিশ। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাদকবিরোধী অভিযান সফল করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আসছে। মাদক বিষয়ক মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এমনকি ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে যুগোপোযোগী করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ভারত থেকে মাদকদ্রব্য আসা বন্ধ করতে বাংলাদেশেকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাদক কারখানা সরিয়ে নেবে এমনটি আশা করাও ঠিক হবে না। কেননা বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতীয় মাদকদ্রব্য বা বিষাক্ত পণ্যের একক বাজার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে ভারত থেকে আসা মরণঘাতি মাদক দেশের অভ্যন্তরে সেবনকারীদের হাতে পৌছাতে কিছু অসাধু পুলিশ সদস্য জড়িত। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই ৬ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদকের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচচ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার টি.এম মোজাহিদুল ইসলাম। বাংলাদেশ সরকার মাদকের অপব্যবহারকে অন্যতম মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও দ্বি-পাক্ষিক প্রচেষ্টার প্রতি দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। এদিকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থাকলেও নিয়ন্ত্রণে নেই কার্যকর ভূমিকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৬ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ প্রায় ৪ কোটি ১৯ লক্ষ টাকার মাদকদ্রব্য আটক করেছে। গত বছরে মাদকের মামলা হয়েছে ৯৮৫টি এবং মাদক মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ১১৫৮ জন। অন্যদিকে পরিসংখ্যান দেয়ার মত তথ্য দিতে পারেনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

জানাযায়, বছরে (বেসরকারি হিসেবে সূত্র: গনমাধ্যম) প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মাদক দ্রব্য, বিষাক্ত ওষুধ আর রাসায়নিক দ্রব্য বাংলাদেশে আসছে। ভারত একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, অপরদিকে এ দেশের যুব সমাজকে ধ্বংস করছে। ভারত থেকে মাদক দ্রব্যের পাশাপাশি অস্ত্র, অশ্লীল ছবি, যৌন উত্তেজক সামগ্রী অবাধেই বাংলাদেশে প্রবেশ করছে ফলে ধ্বংস হচ্ছে এদেশের যুব সমাজ ।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment