চাঁপাইনবাবগঞ্জে কোচিং বাণিজ্যের আগ্রাসনে শিক্ষার্থীরা

ফারুক আহমেদ চৌধুরীঃ  চাঁপাইনাববগঞ্জে কোচিং বাণিজ্যের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। কোচিংয়ের বিষাক্ত ছোবলে নাকাল শিক্ষা ব্যবস্থা। ২০১২ সালে কোচিং বাণিজ্য বন্ধের লক্ষ্যে সরকার ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা প্রণয়ন করে। এই নীতিমালায় শিক্ষকরা নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেনা, বিদ্যালয় চলাকালীন কোচিং না করানোসহ বিভিন্ন বিধিনিষেধ এবং দিকনির্দেশনা আরোপ করা হয়। তবে বিধিমালা আর আইন শুধু কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। নীতিমালা বাস্তবায়নকারীদের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। নীতিমালাটি প্রণয়নের পর মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠনেরর কথা বলা হয়। তবে নীতিমালা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেয়। শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধে কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দ্বিধাহীনভাবে চলছে কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট হোমগুলো। সকাল হতেই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের প্রাইভেট হোম ও কোচিং সেন্টারের দরজার কড়া নেড়ে ঘুম ভাঙ্গায় শিক্ষকদের। বিশেষ করে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বেসরকারি কলেজের ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকরা ঠিকমত বিদ্যালয়ে যায়না। বিদ্যালয় চলাকালিন তাদের দেখা যায় কোচিং সেন্টারগুলোতে। শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অমনোযোগিতা এবং নিজ শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে নানারকম কৌশল অবলম্বন করে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছে কোচিং সেন্টারে যেতে। তবে বেসরকারি শিক্ষকদের অবস্থা আরো খারাপ। কলেজ গুলোতে যেদিন ক্লাস থাকে সেদিনই শিক্ষকরা অনুপস্থিত থাকছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। জানাগেছে কোচিং সেন্টারগুলো পরিচালনায় রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয় ও বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা। জেলার নামধারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান চলাকালীন ইউনিফর্ম পরিধানরত অবস্থায় দেখা যায় কোচিং সেন্টারগুলোতে। মনিটরিং তৎপরতা না থাকায় বিদ্যালয়গুলোতে এখন ক্লাস হচ্ছে দায়সারা গোছের। যে কারণে শিক্ষকদের বাসায় বাসায় গিয়ে পড়া আর কোচিং সেন্টারগুলোতে ভর্তি হওয়া ছাড়া শিক্ষার্থীদের কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে দিনদিন কোচিং আর প্রাইভেট বাণিজ্যে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। শুধু তাই নয়, একই বিদ্যালয়ের একই বিষয়ের একাধিক শিক্ষকের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা লড়াই চলে শিক্ষার্থী বাগানোর ক্ষেত্রে। আর এটা করতে গিয়ে ক্লাস পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার প্রবণতাও কাজ করে বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রভাতি শিফটের সামাজিক বিজ্ঞানের সহকারীশিক্ষক মোঃ মাহবুবুল হকের বিরুদ্ধে ‘এডভান্স’ নামে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩য় ও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে কোচিং বাণিজ্যের পাশাপাশি ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত কোচিং বাণিজ্য চালাচ্ছে। জানা গেছে, ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগে গত ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সরকারি স্কুলেভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহত দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় রমরমাভাবে কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তিনি ক্লাসে শুধু কুইজ প্রতিযোগিতা করে থাকেন। ক্লাসে ঠিকমত পাঠদান করেননা। অন্যদিকে ক্লাসের ফাঁকে তার এডভান্স কোচিং সেন্টারে গিয়ে বসে থাকেন এবং ক্লাস করান বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ২০১২ সালে তাকে নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রহনপুর সরকারি এবি স্কুলে বদলি করা হলেও তিনি মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ২০১২ সালের ২৮ আগস্ট হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করে রমরমাভাবে কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মারুফ হোসেন ও হরিমোহন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বাদরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও রয়েছে কোচিং পরিচালনার অভিযোগ। এছাড়াও সরকারী বেসরকারী একাধিক শিক্ষক বিভিন্ন কোচিং ও প্রাইভেট হোম খুলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়- এরা শহরের চ্যালেঞ্জিং প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে থাকেন শিক্ষার্থীদের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি বাণিজ্যেও তাদের ব্যপক প্রভাব রয়েছে । চাঁপাইনাববগঞ্জ শহরে ছোট বড় প্রায় শতাধিক কোচিং সেন্টার রয়েছে। উপজেলা সদর এবং গ্রামেও এখন কোচিং বাণিজ্য গড়ে উঠছে। বেআইনীভাবে কোচিং বাণিজ্য চললেও অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিবেন বলে জানালেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষা ও আইসিটি) এরশাদ হোসেন খান। তিনি জানান- আইন বাস্তবায়নে আমরা সর্বদায় সোচ্চার। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে বিধিমালা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে শিক্ষা অফিসার, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশনা রয়েছে। এই কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কাজ করছে শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রশাসন। তবে সরেজমিনে দেখা মিলে ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারি শিক্ষকরাই কোচিং পরিচালনার ভূমিকায়। অনেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরকে প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারের শহর’ বলে আখ্যায়িত করছে। অভিভাবকরা জানান, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর ধরে একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকরা, বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের মনিটরিং এর অভাবেই প্রাইভেট ও কোচিং ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠেছে। ফলে অভিভাবকদের বাধ্য হয়েই কোচিং করাতে হচ্ছে সন্তানদের। জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ মতিউর রহমান জানান- নীতিমালা প্রণয়ণের পর উপজেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী তথা সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোনভাবেই কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেনা। কোচিং ও প্রাইভেট নিঃসন্দেহে সরকারী নীতিমালার পরিপন্থী।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment