অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২৫

মোজাম্মেল ভাইর কর্মীবান্ধব পাণ্ডিত্যহীন নেতৃত্ব, পত্রিকার স্বল্পমূল্য, গেদু চাচার খোলা চিঠিসহ সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার কৌশলে সাপ্তাহিক সুগন্ধা অল্প সময়ের মধ্যে পাঠকপ্রিয়তা পায়। তিনি পাঠকের প্রবণতা অনেকের চেয়ে বেশি বুঝতেন এবং ঘটনাপ্রবাহকে যথাসময়ে ক্যাশ করার ক্ষেত্রে সম্ভবত অদ্বিতীয় ছিলেন। এ গুণের ওপর ভর করেই তিনি সাপ্তাহিত সুগন্ধার পাঠক সংখ্যা ইর্ষণীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মাত্র ছয় মাসের মধ্যে।

সেই সময়ের বাস্তবতায় পত্রিকা দাঁড় করানো মোটেই সহজ সাধ্য ছিল না। কারণ, তখন সাধারণের বিবেচনায় দৈনিক পত্রিকা বলতে বুঝাতো দৈনিক বাংলা, আর সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে বিবেচনা করা হতো একমাত্র বিচিত্রাকে। আমাকেই অনেকে প্রশ্ন করেছেন, আপনার বিচিত্রার নাম কী? এর ওপর শফিক রেহমান সম্পাদিক সাপ্তাহিক যায়যায়দিন ছিল অন্য রকম দাপটে; কম ছিল না মিনার মাহমুদের সাপ্তাহিক বিচিন্তার দাপটও। এতো সব দাপটের মধ্যে স্বল্প বাজেটের সাপ্তাহিক সুগন্ধা দাঁড় করানো সহজসাধ্য বিষয় ছিল না মোটেই। এর ওপর পত্রিকাটির ছিল ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার খায়রুল আনামের নেতৃত্বে এক বছরের ব্যর্থতার রেকর্ড। টাকাকে ডলার হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতার সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইন প্রথম দফায় হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে আখেরি চেষ্টা হিসেবে মোজাম্মেল ভাইকে পত্রিকার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর তিনি সফল হয়েছেন আশাতীত মাত্রায়। এ  ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল এরশাদ সরকারে ধর্মমন্ত্রী মাওলানা মান্নান পতন ইস্যু। তার পতনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত একাধিক রিপোর্টের কারণে সুগন্ধার বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল; আর এ সুযোগে পত্রিকার দাম এক টাকা বাড়িয়ে তিন টাকা থেকে চার টাকা করেন মোজাম্মেল ভাই। অবশ্য সে সময় নিউজপ্রিন্টের দাম আস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় মূল্য বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না।

জেনারেল এরশাদ মন্ত্রিসভা থেকে ধর্মমন্ত্রী মাওলানা মান্নানকে অপসারণ করেন ৮৮ সালের ১৪ জুন। এ নিয়ে সুগন্ধার প্রচ্ছদ রিপোর্ট ছিল, ‘মাওলানা মান্নান পতন রহস্য।’ এতে লেখা হয়েছিল, ‘৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ হানাদার মুক্ত হবার পর দৈনিক বাংলায় ‘সেই তিন শয়তান কোথায়?’ শিরোনামে ডা. আলীম চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থের অষ্টম খণ্ডে এ ঘটনা সংকলিত হয়েছে। ২৭ ডিসেম্বর রমনা থানা পুলিশ মাওলানা মান্নানকে গ্রেফতার করে। কিন্তু অদৃশ্য ঈশারায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং তিনি আত্মগোপন করেন। পরে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার হাতে ধরা দেন এবং কারাগারে প্রেরিত হন। কারাগার থেকে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি অসুস্থতার অজুহাতে হাসপাতালে প্রেরিত হন। হাসপাতালে থাকা কালে মাওলানা মান্নান চাঁদপুরের তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা কসমিক শফিউল্লাহর কাছ থেকে সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন যে, তিনি ২৫ মার্চের পর নিজ এলাকায় যাননি। মূলত এ সার্টিফিকেট লাভ করার ফলেই তিনি সাধারণ ক্ষমার আওতায় পড়েছেন।’

সুগন্ধার এ রিপোর্টে আরও লেখা হয়েছে, ‘১৯৬০ সালে থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সামান্য বেতনের মসজিদের মুয়াজ্জেম ও মাদ্রাসা শিক্ষক থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন, পাশাপাশি তিনি কল্পনাতীত অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন অপ্রকাশ্য উৎস থেকে।’  সুগন্ধার উল্লিখিত রিপোর্টে মাওলানা মান্নানের শিক্ষার গোজামিল এবং এনিয়ে মামলা থেকে শুরু ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত নানান দিক তুলে ধরা হয়েছিল। ফলে পত্রিকা বিক্রি হয়েছিল হট কেকের মতো।

এর পর প্রায় পাঁচ মাস ধরে প্রতি সংখ্যায়ই মাওলানা মান্নান প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো না কোনো রিপোর্ট সুগন্ধায় থাকতোই। আর প্রধানত মাওলানা মান্নানের ওপর নেগেটিভ রিপোর্টের কারণে হু হু করে বেড়ে যায় সুগন্ধার সার্কুলেশন। এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল, মন্ত্রী হবার পরও মুক্তিযুদ্ধের সময় অপকর্মের জন্য ঘৃণিত এ মানুষটি তার ইমেজ থেকে উঠে আসতে পারেননি। যার প্রমাণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেও প্রতিফলিত হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মন্ত্রী ছিলেন; তারা দাপটের রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নিজেদের। কিন্তু এরপরও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকার জন্য তাদের জন্য জনমনে যে ঘৃণার আস্তাকুঁড় গড়ে উঠেছিল তা মন্ত্রিত্ব ও নেতার আঁতর দিয়ে মুছে ফেলা যায়নি। ফলে ফাঁসির দড়িতে মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি জনগণের কোনো সহানুভূতি সৃষ্টি হয়নি।

একই রকম ঘৃণা ছিল মাওলানা মান্নানের প্রতিও।  আর এটি আজ থেকে ২৯ বছর আগেই বুঝতে পেরেছিলেন মোজাম্মেল ভাই। আর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মাওলানা মান্নানের প্রতি এই জন-ঘৃণাই পুঁজি করেছিলেন তিনি সাপ্তাহিক সুগন্ধা জনপ্রিয় করার জন্য। আর বিষয়টিকে চূড়ান্ত ক্যাশ করা হয় ১৩ অক্টোবর ১৯৮৮। এ সংখ্যায় প্রচ্ছদ রিপোর্ট করা হলো, ‘জনতার আদালতে মাও. মান্নান।’

এ রিপোর্টে মাওলানা মান্নানের অনেক অজানা বিষয় তুলে ধরা হয়। এ রিপোর্টে তুলে ধরা হয়, বঙ্গবন্ধুর উদারতায় সুযোগ নিয়ে মাওলানা তর্কবাগীশ মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষকদের যে সংগঠিত গড়ে তুলেছিলেন তা  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাযজ্ঞের পর চলে যায় মাওলানা মান্নানের দখলে। আর এ সংগঠনকে পুঁজি করেই বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হন মাওলানা মান্নান। এ সংগঠনের মাধ্যমেই দৈনিক ইনকিলাব প্রকাশ করার আগেই সাত কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয় দরিদ্র মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষকদের কাছ থেকে। এবং মাওলানা মান্নান সামরিক সরকারের মন্ত্রীও হয়েছেন মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের পুঁজি করেই। সুগন্ধার রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, ‘মাওলানা মান্নান অর্থ উপার্জনের অবলম্বন হিসেবে আগাগোড়া কোনো না কোনো সংগঠনকে ব্যবহার করেছেন। কখনো কখনো আবার একাধিক সংগঠনকে ব্যবহার করেন। পাকিস্তান আমলে তিনি মুসলিম লীগকে ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশ আমলে ব্যবহার করেছেন মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠনকে। এ সংগঠনই তাকে অকল্পনীয় বৈভব প্রদান করেছে। এটি ছিল তার সোনার ডিম দেয়া রাজ হাস। মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি পরবর্তীতে বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদারেছীনের নেতৃত্ব মাওলানা এম এ মানান আসেন শৃগালের শঠতা প্রয়োগ করে।”

মাদ্রাস ছাত্র-শিক্ষকদের দলে টানার কৌশল হিসেবে স্বাধীনতাবিরোধী মাওলানা মান্নানকে মন্ত্রী করেন জেনারেল এরশাদ। কিন্তু লাভের চেয়ে লোকশানের পাল্লা ভারি হওয়ায় তাকে অপসারণ করেন মন্ত্রিসভা থেকে। এদিকে ৭১-এর ইমেজ ছাপিয়ে মাওলানা মান্নান তত দিনে বেশ শক্ত অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ফলে মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেবার পরও তাকে কাবু করা যাচ্ছিল না। ফলে সহজ কৌশলে গেলেন হাঁটুর বুদ্ধিতে রাজনীতি করা জেনারেল এরশাদ। ১৯৮৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মাওলানা মান্নানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। গুলশান থানায় দুর্নীতি দমন ব্যুরোর দায়ের করা মামলায় অই দিন দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ‘উচ্চ রক্তচাপ, বহুমুত্র ও হৃদরোগ’ নিয়ে মাওলানা মান্নান ২৮ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়াদী হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর তিনি আদালতে জামিন প্রার্থনা করেন। উল্লেখ্য, হাসপাতালে ভর্তি হবার পর তাকে গুরুতর অসুস্থ হিসেবে যে ডাক্তার সার্টিফিকেট প্রদান করেছিলেন সেই ডাক্তারেকে স্বস্ত্রীক সরকারি খরচে হজ করিয় এনেছিলেন ধর্মমন্ত্রী থাকা কালে মাওলানা মান্নান।  এসব খবরই ছিল মোজাম্মেল ভাইর কাছে। তিনি সিনেমার স্ক্রিপ্ট ব্রিফ করা মতো পুরো বিষয় আমাকে বলেছিলেন। এর সঙ্গে আরো খোঁজ খবর ও একাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারসহ ‘মাওলানা মান্নানের উত্থান পতন’ শিরো নামে প্রচ্ছদ রিপোর্ট তৈরি করলাম আমি; কাভারে ছবি আকলো অসীম কুমার সুর। যাতে দেখা যাচ্ছে,  গম ক্ষেতে খুটার সঙ্গে গরু আকৃতির মাওলানা মান্নান বাঁধা আছেন। এই রিপোর্টের কারণে সমর্থক হয়েছিল মাওলানা মান্নান ও গম। যেভাবে এক সময় কাজী জাফর ও চিনি সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। উল্লেখ্য, মাওলানা মান্নানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল ২০ লাখ টাকা মূল্যের গম আত্মসাতের অভিযোগে।

লেখক: জেষ্ঠ্য সাংবাদিক

Please follow and like us:

Related posts