বৃদ্ধাশ্রমে সন্তানের জন্য মায়েদের হাহাকার

গাজীপুর: যতই কষ্ট-যন্ত্রণা হউক মা সবসময় সন্তানের মঙ্গলই কামনা করেন। কোন মা চান না সন্তান কষ্ট পাক। সন্ত্রানকে কখনো অভিশাপ দেন না। কামনা করেন সন্তানের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হউক। ফিরে আসুক সুখের সেই দিনগুলো।

সন্তান ‘কু’ হলেও কোন মা কখনো ‘কু’হতে পারেন না। সন্তান মায়ের অবাধ্য হলে বা ভরণ-পোষণ না করলেও সন্তানের মায়া ত্যাগ করতে পারেন না মা। সন্তানের কাছে জায়গা না পেয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করলেও অধিকার আদায়ে আইনের আশ্রয় নিয়ে সন্তানের সম্মানহানি করতে চান না বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মায়েরা।

আজ ‘মা দিবস’। এ দিনে নিজের সন্তান ছেড়ে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা মায়ের অনুভূতি জানতে শনিবার বিকেলে গাজীপুরের বয়ষ্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে সেখানে আশ্রয় নেওয়া কয়েক জন মায়ের সঙ্গে কথা বললে তারা এমন অভিব্যাক্তি ব্যক্ত করেন। বর্তমানে এ পুনর্বাসন কেন্দ্রে ১০৯ জন বয়স্ক মা বসবাস করছেন। বয়স্ক পুরুষ রয়েছেন ১০১ জন। এদের অনেকেই আছেন অনেক দিন ধরে। আবার কেউ নতুন এসেছেন।

প্রায় তিন বছর ধরে এ আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন যশোরের রাবেয়া খাতুন। তিনি জানান, তার স্বামী যশোর জজ আদালতে চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদাররা তার স্বামী এবং বড় ছেলেকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তখন বড় ছেলে বিএ -তে পড়ছিল। অন্য দুই ছেলে ও  দুই মেয়েকে অতিকষ্টে এমনকি অন্যের বাড়ি কাজ করে বড় করেছেন। মেঝ ছেলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে এখন ফলের ব্যবসা করে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছেলেকে কিছু জমি দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পর্যন্ত লেখাপড়া করান। সুন্দরভাবেই চলছিল সংসার। ছোট ছেলে বিয়ের করার পর এক পর্যায়ে জোর করে তার নিকট থেকে জমি লিখে নেয়। তারা ঢাকায় বসবাস করে। তারা মায়ের ভরণ-পোষণ ঠিকমত করছিল না। পরে এক প্রতিবেশির মাধ্যমে তিনবছর আগে এ আশ্রয় কেন্দ্রে চলে আসেন।

তিনি বলেন,  ‘আমার কষ্ট হলেও কোনদিনও তাদের কোন অভিশাপ দেইনি। শুধু আমি কেন, কোন মা  চায় না সন্তান কষ্ট পাক। মাঝে মঝে কামনা করি তাদের মনটার পরিবর্তন হউক।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নিতে চাই না। যতদিন বেঁচে আছি এ আশ্রয় কেন্দ্রেই থেকে যেতে চাই।’

কথা হয় পাবনার ন্যাংড়াবাড়ি এলাকার পড়শি কোরাইশির সঙ্গে। তার বয়স আনুমানিক ৮০ বছর। তিনি জানান, তার বাপের বাড়ি পাবনার মাথুরামপুর মিশন এলাকায়। সংসার জীবনে তাদের সাত ছেলে ও এক মেয়ে হয়েছিল। তার মধ্যে দুই ছেলে ও এক মেয়ে মারা গেছে। স্বামী গত হয়েছে তাও প্রায় বিশ বছর। বড় ছেলে আগে আশুলিয়া এলাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করত। এখন বেকার, গ্রামের বাড়িতে থাকে। দ্বিতীয় ছেলে কুয়েত প্রবাসি। তৃতীয় ছেলে ঢাকায় শ্বশুরবাড়িতে থেকে বাসাবাড়ির দারোয়ানের কাজ করে। চতুর্থ ছেলে জাহাজের কুলি ছিলেন, প্রায় এক বছর যাবত তারও কোন খোঁজ নেই। পঞ্চম ছেলে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন, তার অর্থনৈতিক অবস্থাও তেমন ভাল না। বড় ছেলে ও তার বউ এবং দ্বিতীয় ছেলের বউ পাবনার গ্রামে বাড়িতে থাকেন। তাদের সাথেই তিনি সেখানে বসবাস করতেন। বয়স্কভাতা, কুয়েক প্রবাসী কিছু আত্মীয়দের দেওয়া আর্থিক সাহায্যে তিনি পাটের শলা আর টিন দিয়ে একটি ঘর বানিয়ে থাকতেন। কিডনির অসুখ শরীরে বাসা বাঁধে। স্থানীয় মিশনের ফাদারের সহযোগিতায় রাজশাহীতে অসুখের চিকিৎসা করিয়েছেন।  ডান কিডনিটি নষ্ট হয়ে গেছে।  সেবা শুশ্রূষাতো দূরের কথা ছেলের বউরা তার সাথে ভাল ব্যবহার করত না। পরে স্থানীয় এক ব্যাংক কর্মকর্তার সহযোগিতায় প্রায় সাত মাস আগে এ কেন্দ্রে আসেন।  বড় ছেলে এর মধ্যে ৩/৪ বার এসে দেখা করে গেছে। অন্যরা আসে না। এ নিয়ে তার কোন অভিযোগও নেই।

তিনি জানান, বয়স্কভাতা আর স্বজনদের অর্থিক সহায়তায় তার থাকা-খাওয়ার সমস্যা ছিল না। ছিল সেবা করার লোকের অভাব। এখানে বাড়ির চেয়ে শতগুণ ভাল আছেন বলে জানান। তাই তিনি এখানেই থাকতে চান। মরার পরেও যেন তাকে এখানে মাটি দেওয়া হয় এ কথা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিয়েছেন ।

ফিরোজা রহমান (৬২) আদি নিবাস ভারতের চেন্নাইয়ে। ১৯৭৭ সালে রাজশাহীর প্রকৌশলী নাজিম আহমেদের সাথে বিয়ে হয়। পরে তাদের পরিবারও এ দেশে চলে আসেন এবং ঢাকায় বসবাস করেন। ফিরোজা রহমান এখন আছেন এ বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। তিনি জানান, ৯ মাস দাম্পত্য জীবনের পর লন্ডনে পিএইচডি করতে গিয়ে তার স্বামী নিখোঁজ হন। এরপর আর তার সন্ধান মিলেনি। তাদের ওই দাম্পত্য জীবনে একটি পুত্র সন্তান হয়। পরে সন্তানকে নিয়ে তিনি তার বাবার বাসায় চলে আসেন। প্রথমে বাবার সহযোগিতায়, পরে বাবার মৃত্যুর পর নিজে একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করে ছেলেকে বড় করেন এবং লেখাপড়া শেখান। আশা ছিল ছেলেও বাবার মত বড় প্রকৌশলী হবে। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। ছেলে এখন ঢাকায় কোচিং ব্যবসা করেন। মা-ছেলের সংসার ভালই চলছিল। ইতোমধ্যে মা অবসরে যান। কিন্তু সম্প্রতি পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে ছেলের সাথে বনিবনা না হওয়ায় ৯ মাস আগে তিনি নিজে নিজেই চলে আসেন এ কেন্দ্রে। এখানে আছেন জেনেও ছেলে আর তার কোন খোঁজ নেয়নি। আগে মা দিবস এলে তাকে পছন্দের ফুল আর আইসক্রিম গিফট করত।

তিনি বলেন, ‘সন্তান ‘কু’ হলেও মা-বাবা ‘কু’ হতে পারে না। মা বাবা আর সন্তানের সম্পর্ক শেকড়ের। অন্তর  থেকে না হলে আইন-আদালত করে এ সম্পর্ক ঠিক রাখা যায় না।

গাজীপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের বিশিয়া কুড়িবাড়ী এলাকায় প্রায় ৭২ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত। কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি খতিব আবদুল জাহিদ মুকুল। তিনি ১৯৮৭ সালে প্রথমে ঢাকার উত্তরায় আজমপুরে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি চালু করেন। পরে তিনি ১৯৯৪ সালে গাজীপুরে নিজস্ব জায়গায় স্থানাস্তর করেন। গাজীপুর জেলা শহর থেকে আনুমানিক ২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান।

কেন্দ্রের ভেতরে রয়েছে সারি সারি নানা জাতের অসংখ্য গাছ। রয়েছে ফুল-ফলের বাগান ও পুকুর। পুকুরের সামনে মসজিদ, অজুখানা, রয়েছে পাঁচ তলাবিশিষ্ট তিনটি ভবন ও টিনশেডের একটি বড় ভবন। নিবাসীদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে মেডিকেল ইউনিট। বিনোদনের জন্য রয়েছে টিভিরুম, কমনরুম এবং পত্রপত্রিকা ও বই পড়ার সুবিধা। এখানে প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমির ওপর তৈরি করা হয়েছে কবরস্থান।

পুনর্বাসন কেন্দ্রের ম্যানেজার আবু শরীফ জানান, ষাটোর্ধ্ব  প্রবীণদের এই কেন্দ্রে আশ্রয় দেওয়া হয়। এখানে আশ্রিতরা থাকেন বিনা খরচে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ সব দেখভাল করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষেরই। বর্তমানে এ কেন্দ্রের আশ্রিতদের মধ্য ১৬ জন হিন্দু আর তিনজন খ্রিস্টান। এখানে প্রত্যেকের নিজে নিজ ধর্ম পালন করার ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি জানান, সকালের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রবীণদের দিন। এরপর তারা বের হন হাঁটতে। সকাল ৮টার মধ্যে নাশতা তৈরি হয়ে যায়। রুটিন অনুযায়ী খাবার পরিবেশন করা। নাস্তা, দুপুরের খাবার সেরে নামাজ-প্রার্থণা সেরে কেউ মেতে ওঠেন গল্প করায়, কেউবা লুডু-দাবা খেলেন, কেউবা পত্রিকা-বই পড়েন। রাতে কেউ সময় কাটান টিভি দেখে, কেউবা চলে যান বিশ্রামে।

এখানে উৎপাদিত ফলমূল, শস্য, শাকসবজি, মাছ সব কিছুই নিবাসীদের জন্য ব্যবহার করা হয়। তাদের দেখাশুনা ও পরিচর্যা করার জন্য রয়েছেন ২৭ জন পুরুষ-মহিলা। চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ইউনিটে রয়েছেন তিনজন চিকিৎসক, দুজন সেবিকা। রয়েছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। আশ্রিতদের সর্বক্ষণই চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। প্রয়োজনে তাৎক্ষনিক তাদের ঢাকার বিভিন্ন উন্নত হাসপাতাল অথবা শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment