ফানুস রমজান: মিশরের ঐতিহ্যবাহী আলোকলন্ঠন

0

সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়  রমজান মাস পালন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পৃথিবীর সব জায়গায় রোজা রাখা শুরু হয়ে যাবে। ইসলামি ক্যালেন্ডারের এই গুরুত্বপূর্ণ মাস উদযাপনে শহরগুলোতে নানাভাবে আলোকসজ্জা হয়। নিজ নিজ অঞ্চলের ঐতিহ্য অনুসারে বিভিন্ন আলোক সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয় ঘরবাড়ি, মসজিদসহ ধর্মীয় স্থাপনা সমূহ।


আমাদের দেশেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ মসজিদগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়। স্বাভাবিকভাবে ডেকোরেশনের দোকানের সাধারণ বিজলী বাতি দিতে এটা করা হয়। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই এ পবিত্র মাসের আগমন উপলক্ষে আয়োজন করা হয় বিশেষ আলোকসজ্জা। শুধুমাত্র রমজানকে সামনে রেখেই এর জন্য নানা আয়োজনের প্রস্তুতি নেয় স্থানীয় মুসলমানরা।

মিশরের এক ধরণের বিশেষ আলোক লন্ঠন তৈরি করা হয়, এর নাম ‘ফানুস’।  রঙিন এসব ফানুস ভবন, ঘরবাড়ি এবং দোকানের প্রবেশদ্বারে ঝুলিয়ে দিয়ে চারিদিকে আলোকিত করা হয়। আমাদের দেশে ফানুসকে বৌদ্ধ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সাথে সম্পৃক্ত দেখতে পাই।

গোটা উপমহাদেশেই একই চিত্র। মহাপুরুষ গৌতম বুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত আচারিকতায় এ ফানুস আকাশে উড়িয়ে দেয়া হয় কিন্তু মিশরের এই ফানুস এক ধরণের লন্ঠন যা শুধুমাত্র ঝুলিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন জায়গায় এবং সেটা বিশেষভাবে নির্মিত, বিভিন্ন রঙবেরঙ ও বৈচিত্র্যময়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, নাম একই হলেও দুই ফানুসের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ অঞ্চলের ফানুস উড়ানো হয় ধর্মীয় আচারিকতা পালনে আর মিশর ও আশেপাশের অঞ্চলে ফানুশ ঝুলানো হয় শুধুমাত্র আলোকসজ্জার উদ্দেশ্যে, যাকে এক ধরণের আলোকবাতি বলা যায়।


শুধুমাত্র রমজান মাসেই মিশরের ফানুস ঝুলানো হয় নানা স্থানে। এটি এত বেশি বৈচিত্র্যময় এবং এ মাসে এত বেশি ঝুলানো হয় যে পুরা শহরে অপূর্ব এক রুপ ধারণ করে, যার কারণে এ মাসকে ‘ফানুস রমজান’ নামেও বলা হয়ে থাকে।

পবিত্র এ মাসে ফানুস ঝুলানোর ঐতিহ্য কিন্তু অনেক পুরোনো। এর সাথে কয়েক শত বছরের কাহিনী যুক্ত আছে। এ ফানুসকে ঘিরে নানা কাহিনী চালু আছে নানা অঞ্চলে। তবে একটা কাহিনী এ ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে এবং বেশিরভাগ মানুষ সমর্থন করে থাকে। অধিকাংশ মতে, এ ফানুস প্রথম দেখা যায় মিশরের ফাতেমীয় খেলাফতের সময়। এরপর এই ঐতিহ্য আরব বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।


৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মিশরের মানুষ ও শিশুরা ফাতিমী খলিফা আল-মুয়িজ লি-দীন আল্লাহকে অভিবাদন জানানোর উদ্দেশ্যে এ ধরণের আলোকবাতি জ্বালিয়ে ধরে রেখেছিল, প্রথম রমজানের দিন তারা খলিফার জন্য অপেক্ষা করছিল নগরের উপকন্ঠে। খলিফা এ নান্দনিক আলোকবাতি দেখে কারিগরদের নির্দেশ দেন বাণিজ্যিকভাবে এর প্রস্তুত করতে এবং ছড়িয়ে দিতে। সেইসাথে নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের নির্দেশ দেন সবার বাড়িঘরের সামনে এ বাতি ঝুলাতে, এর অমান্য হলে শাস্তির কথাও ঘোষণা করেন তিনি। এরপর থেকেই মূলত এ বাতি জ্বালানোর সংস্কৃতি শুরু হয়।

বর্ণনামতে, ফাতেমী খেলাফতের এক খলিফা নারীকে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল শরীয়ত মোতাবেক। তবে শুধুমাত্র রমজান মাসেই নারীরা নানা কারণে বের হতে পারত, বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য। এ সময় শিশুরা এ আলোকবাতি হাতে নারীদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত এবং এর মাধ্যমে পুরুষরাও নারীদের চলাচলের সংকেত পেত। এভাবেই কায়রোতে রমজান মাসে এই ফানুস ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এ সময় শিশু কিশোররা এই ফানুস হাতে চলতে চলতে রমজানের মাহাত্ম নিয়ে ঐতিহ্যবাহী গান গায়।


বর্তমানে মিশরে ফানুস বানানোর জন্য কয়েক ডজন কারখানা আছে। নানা আকৃতির, নানা ডিজাইনের রঙবেরঙের ফানুস তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে এখানে।  পিতল, টিন, কাঁচ দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই ফানুস বানানো হয়। আবার উচ্চমূল্যের কারণে অনেকেই এই ফানুস কিনতে না পারলেও তারা প্লাস্টিকের ফানুস কিনে, যেগুলো চীন থেকে আমদানী করা হয়। যদিও বিদ্যুতায়নের কারণে আলোর প্রয়োজনে এই ফানুস এখন ব্যবহার হয় না কিন্তু রমজানের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে আলোকসজ্জার জন্য এই ঐতিহ্যবাহী ফানুস ঝুলানো হয় বিভিন্ন স্থানে। সূত্র: দ্যা নিউ আরব

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ