কোচিংবাজ শিক্ষকের মিথ্যাচার বনাম নির্ভিক সাংবাদিকতা

কুলাঙ্গার শিক্ষক নামে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেশ সুপরিচিতি পেয়ে বসেছেন মাহাবুবুল হক । বেশ কয়েকদিন থেকেই ভাবছি মাহাবুব স্যার কর্তৃক সাংবাদিক হামলা নিয়ে কিছু লিখব । আজ লিখেই ফেললাম । গত ২৭ এপ্রিল দৈনিক নবচেতনা ও ২৯ এপ্রিল শনিবার দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকার ১১ পাতায় “চাঁপাইনবাবগঞ্জে লাগামহীন কোচিংবাণিজ্য” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ।
মূলত প্রতিবেদনটির মূল উদ্দেশ্য কোন নির্দিষ্ট কোচিং কে ঘিরে ছিলনা । চাঁপাইনবাবগঞ্জের সমস্ত কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত । সংবাদ প্রকাশের জের ধরে ক্ষিপ্ত হয়ে গত ৩০ এপ্রিল দুই সাংবাদিকের উপর অতর্কিত হামলা চালায় এডভান্স কোচিং সেন্টারের পরিচালক হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রভাতি শিফটের সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক মাহাবুবুল হক । ঐ দিন ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বের সংবাদ সংগ্রহের জন্য দুই সাংবাদিক ফারুক ভাই ও মেহেদি ভাই সন্ধ্যা পনে ৬টা নাগাদ এডভান্স কোচিং সেন্টার সংলগ্ন এলাকায় (সরেজমিনে) গেলে ভেতর থেকে মাহাবুব স্যার ও তার অন্যতম চামচা আরাফাত বাইরে এসে সাংবাদিকদের ধমকের স্বরে কোচিং সেন্টার এলাকায় প্রবেশের কারন জানতে চাই, সাংবাদিকরা বলে সরকারি নিয়মের পরিপন্থি কোচিংগুলো নিয়েই তাদের প্রতিবেদন । কোচিং বাণিজ্য অবৈধ । স্যারের কোন প্রশ্নের উত্তর তারা দিবেন না বললে, মাহাবুব স্যার রেগে গিয়ে সাংবাদিকদের সাথে অন্যায় আচরণ করে পাশের পুকুরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিলে ফারুক ভাই তার প্রতিবাদ করেন । এক পর্যায়ে মাহাবুব স্যার নিজেই প্রথমে সাংবাদিক ফারুক ভাইকে ধাক্কা দিলে তার চামচা আরাফাত ও কোচিং এর অন্যান্য শিক্ষকরা চেয়ার দিয়ে সাংবাদিকদের এলোপাথাড়ি আঘাত করে। এতে মেহেদি ভাইয়ের চোখের উপরে আঘাত লেগে রক্তাক্ত জখম হয়। উক্ত ঘটনার সাক্ষী উপস্থিত সকল অভিভাবক । পরে মাহাবুব স্যার অভিভাবকদের বলেন, তারা যেন মানুষকে বলে এই যে, পুরো দোষটাই সাংবাদিকদের । তারা চাঁদাবাজি করতে এসেছিল । মাহাবুব স্যার অভিভাবকদের এও শিখিয়ে দেন যে, শুধু কোচিং এর শিক্ষকরাই নয় বরং তারাও চাঁদাবাজ সাংবাদিকদের মেরেছেন । এরপর মেহেদি ভাই থানায় অভিযোগ লেখাতে গেলে জানতে পারে মাহাবুব স্যার আগেই থানায় ফোন করে বলে, সাংবাদিকরা ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা চেয়েছিল ও মহিলা অভিভাবকদের ছবি তুলছিল তাই অভিভাবকরাই তাদের পিটিয়েছেন । এ ঘটনায় আহত সাংবাদিক ফারুক আহমেদ চৌধুরী বাদী হয়ে থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এজাহারটি সাধারন ডায়েরিভুক্ত করে তদন্তে অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন সদর থানা পুলিশ। আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ দেয়ার পর দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদাবাজির মামলার হুমকি দিয়ে আসছিল অভিযুক্ত শিক্ষক মাহাবুবুল হক ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রভাবশালী আইনজীবী ও স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন তিনি । সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনায় একই দিন তারিখ দেখিয়ে ২৮ দিন পর কোচিংবাজ শিক্ষক মাহাবুবুল হকের স্ত্রী শামিমা নাসরিন বাদী হয়ে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ এনে ৪৪৮/৩২৩/৩৮৫/৪২৭/৩৪ ধারায় আদালতে মিথ্যা মামলা করে । হামলা হল ২৮ দিন আগে । আর আদালতে মামলা দায়ের করেছেন ২৮ দিন পর । তাও আবার নিজের স্ত্রীকে বাদী করে । হায়রে কাপুরুষ! এই ২৮ দিন ধরে কি তবে কুলাঙ্গার মাহাবুব তার পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলেন? নাকি মিথ্যা বানোয়াট কাহিনীর সুপরিকল্পিত ধারাকে সত্যের রুপ দিতেই তার ২৮ দিন লেগে গেল । জনসম্মুখে সত্য এখন উন্মুক্ত । মামলার এজাহারে কুলাঙ্গার মাহাবুবের স্ত্রী শামিমা নাসরিন এডভান্স কোচিং কে বৈধ বলে দাবি করেছে ।
‘‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা- ২০১২ এর ১৩ অনুচ্ছেদে শাস্তির বিধান রয়েছে । এছাড়া নীতিমালা ১৩- এর (ঙ)- তে বলা হয়েছে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যের জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী নীতিমালা ১৯৮৫ এর অধীনে অসাদাচরন হিসেবে গণ্য করে শাস্তিমূলক ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে । শামিমা নাসরিন কি আইন সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞানটুকুও রাখেন না । মূর্খের ন্যায় কথা বলে । ঘটনার প্রায় ১ মাস পর নিজের স্ত্রীকে ঢাল করে তরুন ও নির্ভীক সাংবাদিকদের ঘায়েল করতে আদালতে মামলা দায়ের করিয়েছেন কুলাঙ্গার মাহাবুব । উল্লেখ্য যে, ঘটনার সময় শামীমা নাসরিন ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না ।

মাহাবুব স্যারের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও টাকার আদলে অদৃশ্য ক্ষমতার কিছু উদাহরন-

১. কোচিংবাজ শিক্ষক মাহাবুব সামাজিক বিজ্ঞানের সহকারি শিক্ষক হয়েও কোচিং ব্যাবসায়কে সফল করার জন্য অভিভাবক মহলে নিজেকে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে নিজেকে দাবি করেন । যা শিক্ষকদের নীতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ।

২. কোচিং ব্যাবসায়কে সফল করার জন্য তিনি বিদ্যালয়ের ক্লাস ফাকি দিয়ে কোচিং-এ এসে সময় দেন । বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমেটির অগোচরে নেই কিছুই । তবুও কুত্তার দল নিরব দর্শকের ভূমিকায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমেটির সদস্যরা ।

৩. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হরিমহনের কোন এক ছাত্রের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বিদ্যালয়ের ক্লাশে সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও মাহাবুব স্যার ক্লাশে পাঠ্য বই না পড়িয়ে প্রতি ক্লাশে কুইজ প্রতিযোগিতা করেন । ঠিকমতো ক্লাশে পাঠদান করেনা এবং তার কোচিং-এ ছাত্রদের ভর্তির জন্য উৎসাহিত করেন ।

৪. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩য় ও ৬ষ্ঠ শ্রেনিতে ভর্তি পরিক্ষার সময় নিয়ম বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে একাধিকবার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় । যা শিক্ষক হিসেবে তার জন্য একটি কলঙ্কজনক ঘটনা ।

৫. ২০১৬ সালে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে তিনি গোপনে নিয়ম ভঙ্গ করে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রবেশের দায়ে তাকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে এনে প্রশাসন দ্বারা লাঞ্ছিত করা হয় । তারপরেও তার কোন বোধোদয় নেই শুধুমাত্র কোচিং বাণিজ্যের জন্য ।

৬. মাহাবুবুল হক চাকরি জীবনে প্রায় এক দশক পার করলেও বাধ্যতামূলক বিএড ডিগ্রী অর্জনের জন্য গত বছর নিয়ম ভঙ্গ করে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের পরিবর্তে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএড করেছেন যা এখানেও শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়ম ভঙ্গ করেছেন ।

৭. বিদ্যালয়ের পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ তিনি তার কোচিংএর শিক্ষকদের দ্বারা করিয়ে নেন । যেমন- বিদ্যালয়ের পরিক্ষার খাতা মূল্যয়ন , প্রশ্নপত্র তৈরি ইত্যাদি ।

৮. ভর্তি বাণিজ্যে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির অভিযোগে এর আগেও তাকে গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর এবি স্কুলে বদলি করা হয় । তবে অদৃশ্য ক্ষমতার দাপটে আবারও হরিমহনে এসে কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন এই কুলাঙ্গার শিক্ষক মাহাবুব ।


লেখক : মাসিদুল রেজা খান সান

Please follow and like us:

Related posts