এবার পুরুষাঙ্গে পেরেক ঢুকিয়ে শিশু নির্যাতন, অবস্থা আশঙ্কাজনক

বাড়ির সামনের রাস্তার উপর এক মেয়ের সাথে কথা বলার অপরাধে পারভেজ মোল্ল্যা (১৩) নামের এক শিশুকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত ২২ জুন বিকেলে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার দাস বাইসা গ্রামে। ওই শিশুকে ব্যাপক মারপিট করে ধরে নিয়ে গোপন স্থানে আটকে রাখে মেয়ের পিতা ও চাচারা। পরে রাতভর তাকে হাত, পা, বুক, পিঠে পিটিয়ে, পাড়িয়ে এবং পুরুষাঙ্গে পেরেক ঢুকিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পারভেজের নানা লিটন চৌধুরী।

নির্যাতনের সময় পারভেজ মলমূত্র ত্যাগ করে ফেললেও পাষন্ডরা তাকে ছাড়েনি। নির্যাতনের কারনে জ্ঞান হারায় পারভেজ। গত ১২ দিনেও তার জ্ঞান ফেরেনি। নির্যাতনকারীরা এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় ঘটনাটি ধামা চাপা পড়ে যায়। পারভেজ কে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এলাকায় আনার পর বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় সোমবার (৩ জুলাই) পারভেজের মা পারভিনা বেগম বাদি হয়ে ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ২ জনকে আসামিক করে কালীগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। যার মামলা নং-২। তারিখ-০৩/০৭/২০১৭ ইং।

মামলার আসামিরা হচ্ছেন, দাস বাইসা গ্রামের মৃত ছদোর আলী লস্কারের তিন ছেলে আজিজুল লস্কার (৪২),মাজিদুল লস্কার ( ৩৮) রবিউল লস্কার (৩৫)। অন্যান্য আসামিরা হচ্ছেন, দাস বাইসা গ্রামের তছির উদ্দীন, আব্দুস সালাম, ইমামুল, আজিজ শেখ, আজিজুলসহ অজ্ঞাত আরো ২ জন। মামলার পর পুলিশ মাজিদুল লস্কার, তছির উদ্দীন ও সন্দিগ্ধ আলফাজ নামের তিনজনকে গ্রেফতার করেছে।

খোঁজখবর নিয়ে জানাগেছে, গত ২২ জুন বিকেলে কালীগঞ্জ উপজেলার দাস বাইসা গ্রামের রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আজিজুল লস্কারের মেয়ে মর্জিনার সাথে শিশু পারভেজ কথা বলছিল। কথা বলার অপরাধে উপরোক্ত আসামিরা তাকে ব্যাপক মারপিট করে। পরে তাকে ধরে নিয়ে গোপন স্থানে রেখে দেয়। মারপিটের সময় পারভেজের সাথে থাকা নাজমূল নামের অপর শিশু দৌড়িয়ে পালিয়ে যেয়ে বাড়িতে খবর দেয়। পরিবারের লোকজন এসে আজিজুল লস্কারের কাছে তার ছেলেকে ফেরত চায় পারভেজে মা পারভিনা বেগম। তখন আজিজুল লস্কারসহ তার ভাইরা বলেন আমরা তাকে মারপিট করে তাকে ছেড়ে দিয়েছি।

কিন্তু পারভেজের নানা লিটন চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, তাকে রাতে একটি পাট ক্ষেত ও এলাকার একটি গোডাউনের মধ্যে আটকে রেখে পুরুষাঙ্গে পেরেক ঢুকিয়ে এবং বুকে উপর পাড়িয়ে এবং পিটিয়ে নির্যাতন করে। নির্যাতনের ফলে সে রক্তাক্ত জখম হয় ও মলমূত্র ত্যাগ করে ফেলে। তারপরও তারা তাকে ছাড়েনি। তার নির্যাতনের চিৎকার পাশ্ববর্তী বাড়ির লোকজন শুনতে পেয়েছেও বলে তিনি অভিযোগ করেন।

নির্যাতিত পারভেজের মা পারভীনা বেগম জানান, পরের দিন ২৩ জুন দুপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সাগর বিশ্বাস ফোনে জানায়, তোমাদের ছেলেকে পাওয়া গেছে, এসে নিয়ে যাও। এরপর পরিবারের লোকজন যেয়ে দেখে ছেলে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন কোলা ক্যাম্পের আইসি ( ক্যাম্প ইনচার্জ) এসআই মিজানুর রহমান।

নির্যাতনের ফলে আমার ছেলে পারভেজ মলমুত্র ত্যাগ করে ফেলে। যে মলমূত্র তার সমস্ত শরীরে মেখে ছিল। আমরা পাশের একটি টিউবওয়েল থেকে পরিস্কার করে আনি। তারপরও তার টয়লেট বন্ধ হচ্ছিল না। তারা আমাদের জোর করে একটি ভ্যান ডেকে তুলে পাঠিয়ে দেয়।

ছেলের অবস্থা খারাপ দেখে ওইদিন দুপুর ২টার দিকে প্রথমে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করি। পারভেজের অবস্থার অবনতি দেখে ডাক্তাররা তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। সেখানে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সেদিন রাতেই ডাক্তাররা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। আমরা পরের দিন (ঈদের আগের দিন) ঢাকায় নিয়ে যায়। সেখানে তার মাথায় অপারেশন করা হয়েছে। পারভেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০০নং ওয়াডের ইউনিট-২ এর বি-৪০ নং বেডে চিকিৎসাধীন ছিল। সোমবার রাতে তাকে কালীগঞ্জে আনা হয়েছে। এখনো তার জ্ঞান ফেরেনি।

স্থানীয় কোলা ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের মেম্বর জাফর হোসেন জানান, কারা কিভাবে নির্যাতন করেছে এটা আমি বলতে পারবোনা। তবে পারভেজের চিকিৎসার জন্য আমি ব্যক্তিগত ভাবে ১২ হাজার টাকা এবং গ্রাম থেকে প্রায় লক্ষাধিক টাকা সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে। তবে রোগীর ধরন দেখে মনে তাকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে।

পারভেজ মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার পিয়াপুর গ্রামের শিমুল মোল্ল্যার ছেলে। তার বয়স যখন ৪ বছর বছর তখন পিতা-মাতার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর সে কালীগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুর গ্রামে নানা জিল্লুর রহমানের বাড়িতে থাকতো। সম্প্রতি সে রাজমিস্ত্রির সহকারি হিসেবে কাজ করতো।

কালীগঞ্জ থানার অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক। তবে চিকিৎসার জন্য তারা থানায় মামলা করতে আসতে পারেনি। পরে তারা মাগুরা জেলার শাখিলা থাকায় মামলা করতে গিয়েছিল। সেখান থেকে পরামর্শ পেয়ে সোমবার তারা কালীগঞ্জ থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ২ জনকে আসামি করে মামলা দিয়েছে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। শিশু নির্যাতনকারী বাকিদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছাদেকুর রহমান জানান, খবর পেয়ে মঙ্গলবার দুপুরে তিনি ওই শিশুর দেখতে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। টিনের ঘরের প্রচন্ড গরমের মধ্যে তাকে রাখা হয়েছে। তার অবস্থা খুবই খারাপ। তার চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের কাছে ৫ হাজার টাকা দিয়েছে এবং কালীগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানোর জন্য এ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়েছেন।

সুত্রঃবিডি২৪লাইভ
Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment