বিষের আড়ালে মধু হাসিলের গল্প

অমৃত মলঙ্গী 
সব যেন প্রভাতের সুর। কার কোন ধর্ম, কার কী গায়ের রঙ বোঝার উপায় নেই। এক সময় তারা আলোচিত শিশুশিল্পী জাহিদের বন্ধু ছিল। এখন জাহিদ নেই। সে সায়মন রিসোর্টের বাসিন্দা। তবু তার বন্ধুদের সেই অভ্যাস রয়ে গেছে। সৈকতে কাউকে পেলেই একসঙ্গে কোরাস, ‘মধু হই হই, তুমি বিষ খাওয়াইলা।’ তারপর পর্যটককে বসিয়ে ‘বিষের গল্প’ বলতে বলতে নিজেদের ‘মধু’ হাসিল করা!

ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগতে পারে। তাই খোলাসা করা প্রয়োজন। কক্সবাজারের সৈকতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শতশত ছিন্নমূল শিশুদের দেখা যায়। যারা পর্যটকদের শরীর মেসেজ করে, গান শুনিয়ে টাকা আয় করে। সেই সঙ্গে নিজেদের জীবন নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে গল্প ফাঁদে। সেই গল্প শুনতে শুনতে পর্যটকরা কখনও কখনও আবেগী হয়ে পড়েন। কেউ কেঁদে ফেলেন। তারপর টাকা দিয়ে তাদের সান্ত্বনা দেন!

‘আমার বাবাকে দুই মাস আগে কারা যেন খাবারের মধ্যে বিষ দিয়ে মেরে ফেলছে। মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই,’ স্থানীয় ভাষায় রুস্তম নামের এক বালক যা বলছিল তার অর্থ এটাই।

রুস্তমের কথা শুনতে শুনতে মিরাজ, আবেদ আলী, কালু নামের আরও কয়েকজন ভিড় জমায়। কেউ আমার মাথায় হাত দেয়। কেউ পা টিপতে থাকে। ওদের থামিয়ে জীবনের কথা শুনতে চাই।

‘দুই মাস আগে আমার আব্বা সাগরে মইরা গ্যাছে। সারাদিন একবার খাই। স্যার অনেক খিদা লাগছে ট্যাকা দিবেন।’ এলোমেলো চুলের মার্জিয়া এই কথা বলে আর কাঁদে। তাকেও পাশে বসাই।

তোমরা জাহিদকে চেন? প্রশ্ন করতেই সবাই হামলে পড়ে, ‘চিনি মানে। ও তো আমাগো বন্ধু লাগে। এক সময় আমাগো মতো গান গাইয়া ট্যাকা কামাইতো। অহন আর আহে না।’

তোমরা স্কুলে যাও? এবার কেউ কথা বলতে চায় না। কেউ কেউ সাগরের দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। কেউ গান গেয়ে ওঠে, ‘তুমি জ্বালায়ে গ্যালা প্রেমের বাতি, নিভাইয়ে গ্যালা না।’

কয়েক হাত দূরে বছর সাতেকের এক ছেলে দাঁড়ানো। কী যেন বলতে চাইছে। হাত নাড়ছে। কিন্তু কথা শোনা যায় না। ডাকলেও কাছে আসতে চায় না। দূর থেকে ইশারা করে যাচ্ছে।

কিছুতেই কথা বলবে না। এক আঙুল উঁচিয়ে ‘না, না’ ইশারা করছে। কাছে যেতেই দৌড়ে চলে যায়। ওর ওই ‘না, না’ ইশারায় কিছু একটু সন্দেহ হয়। আগের বাচ্চাগুলোও কেমন যেন ভড়কে যায়। কিন্তু ওরা পালায় না।

আবার সেই গল্প। এবার সুমন নামের একজন বলতে থাকে, ‘সে মাদ্রাসায় পড়ে। এতিম। নতুন কাপড় কিনতে হবে। টাকার দরকার।’

পাশ থেকে একজন বলে ওঠে, ‘স্যার ও রোহিঙ্গা। ওরে ট্যাকা দিবেন না।’

‘রোহিঙ্গা বলেই আগে টাকা দিব। ওরা তো বেশি অসহায়।’ এই কথা শুনে স্থানীয় কয়েকজন চুপসে যায়। এবার তারা আরও বেশি কষ্টের গল্প বলতে থাকে।

এতক্ষণ আমার কিছুই বোঝা হয়নি। সৈকতপারে সন্ধে নামছে। জলের বুক ছুঁয়ে সূর্য ডুবিডুবি। আমি ওদের কথা ভাবছি। আর ভেতরে ভেতরে কাঁদছি। ওরা কী করে যেন বুঝে ফেলল আমি আবেগী হয়ে পড়ছি। হঠাৎ একজন বিরহের গান ধরলো, ‘জীবনরে ও জীবনের তুই…।’ যে ছেলেটি নতুন এই গানটি ধরলো, সে গান শেষে স্থানীয় ভাষায় কী যেন বললো। আমি না বুঝলেও বাচ্চাগুলো বুঝে গেছে। তা নিয়ে তাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। মারামারি। হঠাৎ একজন বাংলা বলে উঠলো, ‘তুই বইলা দিলি ক্যান!’

এবার আমি বিষ আর মধুর পার্থক্য বুঝতে পারি। ওদের আবার কাছে ডাকি। এবার জানতে চাই নিজেদের মা-বাবাকে নিয়ে কেন তারা মিথ্যা বললো। বাচ্চাগুলো লজ্জায় চুপসে যায়। গোধূলির বিদায়ী আলোতে ওদের ওই লজ্জা আমাকেও লজ্জায় ডোবায়। জীবনের কথা মিথ্যে হলেও ওদের কঙ্কালসার দেহ আমার কাছে চরম সত্য। ওদের ময়লা চুলের গন্ধ আমার কাছে নিদাঘ বাস্তবতা। সবাইকে দশ টাকা করে দিয়ে আমি সায়মন রিসোর্টে ফিরি। জাহিদের খোঁজে। ততক্ষণে জেনে যাই কারো কারো কথা মিথ্যে হলেও জাহিদের গল্প সত্য। বাবা নেই। মাকে নিয়েই তার পৃথিবী।

সন্ধ্যার পর সায়মনের লবিতে জাহিদ গান গাইতে আসে। তার জন্য ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। যখন খুশি আসে, আবার যখন খুশি চলে যায়। সায়মন থেকে থাকার জায়গা দেয়া হয়েছে। মাকে নিয়ে সে সেখানেই থাকে।

একসময় জাহিদ আসে। গান গায়। লোকে ভিড় করে। গান শেষ হলে জাহিদকে কাছে ডাকি। এই জীবন আর আগের জীবনের পার্থক্য বলে সে, ‘আগে অনেক কষ্ট হতো। এখন ভালো আছি। হোটেল থেকে মাসে তিন হাজার করে টাকা পাই।’

শুধু তাই নয়। সায়মন কর্তৃপক্ষ জাহিদকে কলাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। জাহিদ এখন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে।

জাহিদ এক সময় চলে যায়। রাত বাড়তে থাকে। আমি আবার সৈকতের দিকে পা বাড়াই। জাহিদের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে থাকি। আমি যদি ওদের মতো হতাম, তাহলে কী করতাম। এই ভাবনায় শরীর অবশ হয়ে আসতে চায়। সৈকতের বালিতে পা রাখতেই সেই ছেলেটির দেখা মেলে। যে ‘না, না’ ইশারা করে পালিয়ে গিয়েছিল। এবার আমাকে একা দেখে কাছে আসে। কিন্তু কথা বলে না। পাশ থেকে সৈকতের এক ফটোগ্রাফার বলেন, ‘ওর মা-বাবা নেই। খালার কাছে মানুষ। কথা বলতে পারে না!’

ছেলেটি আবার আঙুল নাড়ে। আমাকে বোঝাতে চায় আগে যারা কথা বলছিল সে সব মিথ্যা ছিল। ওকে ৩০ টাকা দেই। খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ে। আবার দৌড়ে চলে যায়। নামটা জানা হল না। সে উপায়ও ছিল না। আমি ওর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকি। বালির ওপর কচি পায়ের ছাপ। আমার বুকে সেই ছাপ দাগ হয়ে আঁচড় কাটে। বুকটা ভারি মনে হয়। মনে হয় কেউ যেন পাথরচাপা দিয়েছে!

Please follow and like us:

Related posts