অবশেষে নায়কদের কাঁধে করেই রাজার মতো বিদায় নিলেন নায়করাজ

0

নায়করাজ রাজ্জাকের শেষযাত্রা। আজ বুধবার সকাল ঠিক ১০টায় বনানী গোরস্থানে নেওয়া হলো তাঁর মরদেহ। পুলিশি পাহারায় দেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তির মরদেহ বহনকারী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িটি যখন গোরস্থানের ফটক দিয়ে ঢুকছে, তখন ভেতরটা অসংখ্য ভক্তের দখলে। প্রবেশমুখ থেকে সোজা শেষ মাথায় গিয়ে তারপর ডান দিকে মোড়, সেখান থেকে কয়েকটি কবরের পরেই প্রস্তুত ছিল নায়কের শেষ ঠিকানা। বৃষ্টি হচ্ছিল, তাই আগেই টাঙানো হয়েছিল শামিয়ানা।

ছেলে বাপ্পারাজ, বাপ্পী, সম্রাট এবং অভিনেতা শাকিব খান কাঁধে করে নায়করাজকে নিয়ে যান কবরের দিকে। এ সময় পরিবারের লোকজন ছাড়াও ছিলেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান, প্রযোজক সমিতি, পরিচালক সমিতির বেশ কজন সদস্য ও অসংখ্য ভক্ত। প্রিয় অভিনেতাকে শেষবিদায় জানাতে দূর-দূরান্ত থেকে হাজির হয়েছিলেন বহু মানুষ। গোরস্থানে প্রিয় নায়কের একটি জানাজা হবে জানতে পেরে উত্তরা থেকে এসেছিলেন লিফন নামের এক তরুণ। গাজীপুর থেকে হাজির হন হাফেজ ফরহাদ হোসেন। কবরে নামানোর সময় একবার দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলেন এমন ভক্তের সংখ্যা গোনা যাচ্ছিল না।

নায়করাজকে কবরে নামান তাঁর তিন ছেলে ও শাকিব খান। কবরে মাটি দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় দোয়া। সেখানে রাজ্জাকের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।

গতকাল মঙ্গলবার দাফন করার কথা ছিল নায়করাজকে। কিন্তু সবাই অপেক্ষা করে ছিলেন নায়কের মেজ ছেলে বাপ্পীর জন্য। আজ বুধবার ভোরে কানাডার টরন্টো থেকে ঢাকা পৌঁছান রাজ্জাকের মেজ ছেলে রওশন হোসেন বাপ্পী।

বাবাকে দাফনের পর তিনি বলেন, ‘আমার আব্বার মৃত্যুতে সরকার যে অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছে, সে জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী ও দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাই। এটা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। এত মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা যে আমার আব্বা পেল, তা দেখে সন্তান হিসেবে আমি গর্ববোধ করছি। আমি আড়াই বছর দেশে ছিলাম না। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদাই করি যে শেষ পর্যন্ত আমি আসতে পেরেছি। আমি দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, আল্লাহ যেন তাঁকে বেহেশতে নসিব করেন।’

৫০ বছর ধরে এ দেশের মানুষ মাথায় করে রেখেছিল নায়করাজ রাজ্জাককে। আজ সবার ভালোবাসা নিয়েই চিরবিদায় নিলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ২১ আগস্ট  ৬টা ১৩ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন দেশের চলচিত্র অঙ্গনের সকল গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গসহ  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আব্দুর রাজ্জাকের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩শে জুন কলকাতার নাকতলায়। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্বরসতী পূজা চলাকালীন সময়ে মঞ্চ নাটকে এবং শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক বিদ্রোহীতে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়ক রাজের অভিনয়ে সম্পৃক্ততা। সেক্ষেত্রে পরিবারের মধ্যে মেজ ভাই আবদুল গফুরের সমর্থন পান তিনি।

অভিনেতা হওয়ার আশায় ১৯৬১ সালে  মুম্বাইয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন যদিও, তবে সফল না হয়ে ফিরেছিলেন টালিগঞ্জে। পরবর্তীতে শরণার্থী হয়ে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। প্রথমদিকে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করার পর নায়ক হিসেবে ঢালিউডে তার আগমন হয় জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।

প্রায় অর্ধশত বছরের অভিনেতা হিসেবে রাজ্জাকের ঝুলিতে রয়েছে তিনশোটির মতো বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। এর মধ্যে বেশ কয়েকটিই পেয়েছে ক্লাসিকের খ্যাতি। সেই সাথে পরিচালনা করেছেন প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র। গত বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আয়না কাহিনী’ তার সবশেষ পরিচালিত ছবি।

১৯৯০ সালে চিত্রনায়িকা নূতনের বিপরীতে ‘মালামতি’ ছবিতে নায়ক হিসেবে শেষ অভিনয় করেন। নায়কের পাট চুকিয়ে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নতুন পথ চলা শুরু করেন ১৯৯৫ সাল থেকে। কে জানে , হয়তো তখনই মৃত্যু হয় নায়করাজ রাজ্জাকের।

‘কি যে করি’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এরপর আরও চারবার তিনি জাতীয় সম্মাননা পান। পরবর্তীতে  ২০১১ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন।

রাজ্জাক সুচন্দার পর কবরী, ববিতা, শাবানাসহ তখনকার প্রায় সব অভিনেত্রীকে নিয়ে অভিনয় মঞ্চে ঝড় তোলেন। তবে এর মধ্যে রাজ্জাক-কবরী হচ্ছে স্মরণকালের জুটি। এই মহানায়কের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- ‘আনোয়ারা’, ‘সুয়োরাণী-দুয়োরাণী’, ‘দুই ভাই’, ‘মনের মতো বউ’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বেঈমান’।

স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’ দিয়ে অন্য এক পরিচয় মেলে ধরেন রাজ্জাক। ‘আলোর মিছিল’, ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘স্বরলিপি’, ‘কি যে করি’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘আনার কলি’, ‘বাজিমাত’, ‘লাইলি মজনু’, ‘নাতবউ’, ‘মধুমিলন’, ‘অবুঝ মন’, ‘সাধু শয়তান’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘কালো গোলাপ’, ‘নাজমা’সহ অসংখ্য ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের নায়ক রাজ্জাক। ‘বদনাম’, ‘সৎ ভাই’, ‘চাপা ডাঙ্গার বউ’সহ ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন রাজ্জাক।

মহানায়কের এমন মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিরাট বড় এক নক্ষত্রকে হারিয়েছে। কিন্তু এটাও সত্য যে, মৃত্যুতেই তিনি নিঃশেষ হয়ে যাবেন না। বহুকাল ঢাকার চলচ্চিত্র ও দর্শকরা মনে রাখবে নায়করাজ রাজ্জাককে। বিডিমর্নিং ডেস্ক-

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

ব্রেকিং নিউজঃ