‘ওরে পাগলা, তুই গানই গা সারা জীবন’

অনলাইন ডেস্কঃ সদ্য স্বাধীন দেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিন আব্দুল জব্বারকে ডেকে বললেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এমন একটা গান বানা যেমন একুশে ফেব্রুরায়িকে নিয়ে আছে ‘আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো’। যেই বলা সেই কাজ। আব্দুল জব্বারও বাবার আদেশ পালন করতে ছুটে গেলেন কবি ফজল-এ-খোদার কাছে। লেখা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সেই ওমর গান ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’। গানটির সুর করে গাইলেন আব্দুল জব্বার। তারপর শোনালেন বঙ্গবন্ধুকে।

বিষ্ময়ে বিমূঢ় বঙ্গবন্ধু আব্দুল জব্বারকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন কি চাস তুই আমার কাছে। মন্ত্রী হবি। জব্বারের উত্তর না। বেতারের বড় একটা চেয়ার দিই। এবারো জব্বারের উত্তর না। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তাহলে তুই কি চাস? উত্তরে জব্বার বলেছিলেন আমার এখনো অনেক গান গাইতে বাকি। আমি সারা জীবন গানই গাইতে চাই।’ বঙ্গবন্ধু তখন জব্বারের মাথায় হাত রেখে বললেন ‘ওরে পাগলা, তুই গানই গা সারা জীবন।’

বঙ্গবন্ধুর সেই পাগলা আজ সকাল পৌনে দশটার দিকে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে তিনি শ্রদ্ধা করে বাবা বলে ডাকতেন। আর বঙ্গবন্ধুও জব্বারকে পাগলা বলেই সম্বোধন করতেন। আদর করতেন।

তখন ছয় দফা দাবিতে উত্তাল সারা দেশ। আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন সময় আবদুল জব্বার গেয়ে চলেছেন, ‘আমাদের দাবি যারা মানে না, পিটাও তাদের পিটাও’, ‘বন্দি করে যদি ওরা ভাবে খেলা করেছি শেষ, তা হবে মস্ত বড় ভুল।’ এসব গান মানুষকে অধিকার সচেতন করেছে, জুগিয়েছে প্রেরণা।

তাইতো বঙ্গবন্ধু আগরতলা মামলায় ছাড়া পেয়েই তিনি যে কজন মানুষের খোঁজ করেছিলেন তাদের মধ্যে একজন আবদুল জব্বার।

জব্বারের ভাষায় ‘একদিন বেতারে গানের রেকর্ডিংয়ে গেছি। হঠাৎ দেখি বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামাল আমাকে পেছন থেকে ডাকছেন। কাছে যেতেই বললেন, বাবা তোমাকে ডেকেছেন। আমি বললাম, বাবা কিভাবে ডাকল? উনি তো জেলে। তখন শেখ কামাল হেসে বললেন, বাবা ছাড়া পেয়ে ফিরে এসেছেন। সে দিনই রেকর্ডিং ফেলে ছুটলাম ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে। গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে অনেক ভিড়। সবাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ভিড় ঠেলে শেখ কামালের পেছন পেছন দোতলায় উঠে গেলাম। দেখলাম দীর্ঘদেহি পরিপাটি সেই মানুষটাকে। কতক্ষণ যে তাকিয়ে ছিলাম মনে নেই!

বঙ্গবন্ধু বললেন, কিরে বেটা, এমন সব গান গাচ্ছিস, তোকে তো জেলে পাঠিয়ে দেবে ওরা। আমি বললাম, জেলে ঢোকালে ঢোকাক, আমি আগে আপনাকে মনপ্রাণ ভরে দেখে নিই। উনি ঈষৎ হেসেছিলেন। তারপর আমাকে বুকে টেনে নিলেন। ওই মুহূর্ত আমি জীবনেও ভুলব না। এখনো ওই মুহূর্তটা মনে করে ভাবি উনি বেঁচে আছেন, ৩২ নম্বর বাড়িতে গেলেই হয়তো দেখা পাব।’

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment