সুচির ক্ষমতার দৌড় কত?

 

সু চির ক্ষমতার দৌড় কত?

সামরিক জান্তার সঙ্গে সুচি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনে সেনাবাহিনীর অভিযানের প্রেক্ষাপটে দেশটির ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চির ভূমিকা নিয়ে গোটা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কারণ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এই নেত্রী তার সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। রাখাইনে সেনা অভিযানের বৈধতার পক্ষে মত দিয়ে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে এই সেনা অভিযান।’

প্রশ্নবাণে জর্জড়িত হওয়ার আশঙ্কায় চলতি মাসেই অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যোগ দিচ্ছেন না অং সান সুচি। ১৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, অং সান সু চি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেবেন না।

এমন একটা ঘোলাটে অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে আসলে, মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী সু চির আসলে ক্ষমতা কতটুকু? কী করতে পারেন এমন পরিস্থিতিতে? নাকি তিনিও জিম্মি হয়ে আছেন সেনাবাহিনীর কাছে?

মূলত, অং সান সু চির সরকারি পদবী হচ্ছে ‘রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা’। তিনি নিজেই এই পদ সৃষ্টি করেছেন সংবিধানের একটি বিশেষ ধারাকে কেন্দ্র করে। যে ধারাটা মূলত তৈরি করা হয়েছিল তাকেই লক্ষ্য করেই। কারণ মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী কারো স্বামী বিদেশি হলে বা বিদেশি নাগরিকত্ব আছে এমন কোনো ব্যক্তি দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।

সুচি ও কফিন আনান

মিয়ানমারের অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজনীতিক অং সান সু চি এবং ২০১৫ সালে দেশটির জাতীয় নির্বাচনে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডির বিপুল জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মন্ত্রিসভা এবং তার দলের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন তিনি নিজে। পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্বেও আছেন সু চি। এছাড়া দেশটির প্রেসিডেন্ট তিন কিয়াউ মিস সু চির কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়।

মিয়ানমারের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল পূর্ববর্তী সামরিক সরকারের আমলে। ১৯৬২ সাল থেকে শাসন ক্ষমতায় ছিল এই সামরিক সরকার। ২০০৮ সালে অবিশ্বাস্য এক গণভোটের মাধ্যমে এই সংবিধানের অনুমোদন দেয়া হয়। সে সময় সংবিধানের এই অনুমোদনে সু চি কিংবা তার দল এনএলডির কোনো সায় ছিল না।

সেনাবাহিনী ঘোষিত ‘ডিসিপ্লিন-ফ্লোরিশিং ডেমোক্রেসি’র পরিকল্পনা ‌নিশ্চিত করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
এছাড়াও সংবিধানের এই সংশোধনীর আওতায় সংসদের এক চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তিন কিয়াউ মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হলেও অং সান সু চি’র কাছে তাকে জবাব দিতে হয়। স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা এবং সীমান্তসহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছে সেনাবাহিনী। এর অর্থ হচ্ছে দেশটির পুলিশের ওপরও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেনাবাহিনীর।

রোহিঙ্গা সংকটে প্রশ্নবিদ্ধ সুচি

শক্তিশালী জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের ১১টি আসনের মধ্যে ছয়টি আসনেও রয়েছেন সেনাবাহিনী মনোনীত ব্যক্তিরা। গণতান্ত্রিক সরকার বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে এই পরিষদের। অনেক শীর্ষস্থানীয় পদের দখল করে আছেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা। সেনাবাহিনীর ব্যবসায়িক স্বার্থও রয়েছে। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাখাতের যৌথ বাজেটের চেয়েও ১৪ শতাংশ বেশি ব্যয় হয় প্রতিরক্ষা খাতে।

কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনী এবং সু চি’র অবস্থান ছিল তীব্র পরস্পরবিরোধী। সু চি ১৫ বছর গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হেইং এটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, রোহিঙ্গাদের জন্য তার সহানুভূতি নেই। নির্বাচনের পর তারা একসঙ্গে কাজ করার উপায় খুঁজে বের করেন। জনসমর্থন ছিল তার। কিন্তু মিয়ানমারের জেনারেলদের হাতে ছিল আসল ক্ষমতা। সংবিধান সংশোধনের মতো সু চির অনেক চাওয়ার সঙ্গে সেনাবাহিনীর মতৈক্য রয়েছে।

গেল ৭০ বছর ধরে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সীমান্তে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শান্তি আলোচনা নিয়েও সেনাবাহিনীর সঙ্গে মতবিরোধ আছে। তবে তারা অর্থনৈতিক সংস্কার, উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে একমত। মূলত সু চির জনপ্রিয় ‘মন্ত্র’ হচ্ছে ‘আইনের শাসন’। সূত্র: বিবিসি।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment