ইন্দিরা গান্ধী থেকে শেখ হাসিনা, ৭১ থেকে ১৭

সিএন ক্রাইম নিউজ ডেস্ক :  পিছনে বুলেট, আগুন আর স্বজনের লাশ রেখে বাংলাদেশে ঢুকছেন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তরা। ’১৭ সালের এই ছবি মনে করিয়ে দিচ্ছে ’৭১কে। এক দম উল্টো গতির উদ্বাস্তু মিছিল। সে বার উদ্বাস্তরা বাংলাদেশ ছেড়ে পালাচ্ছিলেন অন্য দেশে। এ বার বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন অন্য দেশের ঘরছাড়া মানুষ। দুটো ঘটনার সময়, মানুষ, দেশ, সরকার আলাদা। কিন্তু দু’দল উদ্বাস্তুর চোখের জলের ধারা, কান্নার শব্দ একই। একই তাঁদের আগুনে পোড়া ভিটেমাটি ছেড়ে আসার যন্ত্রণা আর মৃত স্বজনের জন্য হাহাকার।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চ থেকে সারা বাংলাদেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে) ছড়িয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা। গ্রামের পর গ্রাম জ্বলে পুড়ে খাক হতে থাকে। পুরুষের প্রাণ, তাজা রক্ত আর নারীর সম্ভ্রম- এই ছিল হিংস্র পাক বাহিনীর খোরাক। এই অবস্থায় প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসমে। সম্পূর্ণ সম্বলহীন সেই মানুষগুলো। অনেক দীর্ঘশ্বাস, অনেক অভুক্ত শিশুর কান্না, অসহায় মায়ের নীরব চাহনি, একটু আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি, একটু পরে পরে লাশের খাতায় নতুন সংখ্যা- অনেকটা এমনই ছিল ভারতে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর প্রথম দিকের দৃশ্য। একটু খাবার, একটু আশ্রয়, একটু নিরাপত্তার জন্য মানুষগুলোকে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়েছে। পথিমধ্যেই ঝরে গেছে লাখো প্রাণ। কেউ বা মরেছেন পরিশ্রমে, অসুখে নয়তো হানাদারদের থাবায়। এমনও হয়েছে কোথাও যে নদী পাড়ি দিয়ে আর একটু যেতে পারলেই সীমান্ত। কিন্তু নৌকায় আর ওঠা হয় না। তার আগেই পাকিস্তানিদের টহল বোট থেকে ব্রাশফায়ার। মুহূর্তে শেষ সব।

বাংলাদেশের সেই ’৭১ উল্টে ফিরে এসেছে ’১৭ সাল। এ বারে নির্মমতার প্রেক্ষাপট বাংলাদেশেরই প্রতিবেশী মায়ানমার। কোনও ভিনদেশি শাসক নয়, বরং নিজ দেশেই পরবাসী এক জাতিগোষ্ঠীর প্রতি খড়্গহস্ত দেশটির সরকার ও প্রশাসন। সেখানকার নির্যাতনও অনেকটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের মতোই। হাতে কারবাইন নিয়ে অস্ত্রধারী পুলিশ ও সেনারা ঘিরে ধরে জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। রোহিঙ্গা পুরুষের প্রাণ, তাজা রক্ত আর নারীর সম্ভ্রম যেন ওদের টার্গেট। সম্বলহীন মানুষগুলো ছুটে আসছে বাংলাদেশে। সব ছেড়ে পালিয়ে আসার পদে পদেও তাড়া করছে মৃত্যু। রাখাইনের বিবদমান জনগোষ্ঠী, সেনা-পুলিশের গুলি পেরিয়ে যখন সীমান্তে পা রাখেন এই অসহায় মানুষগুলো- তখনও নিরাপদ নন তাঁরা। সেখানে পায়ের নীচে ওৎ পেতে আছে মাইনরূপী মৃত্যুশিখা। পথে নাফ নদীতে নামলেও রক্ষা নেই। সেখানেও গুলি করে মায়ানমারের সেনারা ডুবিয়ে দিচ্ছে নৌকো। নাফ নদীতে ভেসে আসা শিশুদের লাশের ছবি চোখে পড়ছে প্রতি দিন। গত দু’ সপ্তাহে কেবল নাফের পাড়ে শাহপরীর দ্বীপে ভেসে এসেছে অর্ধশতাধিক মরদেহ। যার অধিকাংশই শিশুর।

ইতিহাসের এই দুই সঙ্কটের পরিস্থিতিতেই দুই পীড়িত জনগোষ্ঠীর পাশে দুই রাষ্ট্রপ্রধান। ১৯৭১-এ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিয়েছিলেন বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থীর দায়িত্ব। আর ২০১৭-তে এসে ন’লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। নিজে গিয়ে দেখে এসেছেন রোহিঙ্গাদের। সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘দরকার হলে খাবার ভাগ করে খাবো। তবুও এই পীড়িত মানুষগুলোকে ফেরাবো না।’

রোহিঙ্গাদের প্রতি মায়ানমার সরকারের নির্মমতা মানবিকতার সকল সীমা লঙ্ঘন করেছে। প্রতি দিন হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করছে। সীমান্তের ওপারে অপেক্ষমান লক্ষ রোহিঙ্গা। হিংসার হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে একদম সম্প্রতি প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন বলে মনে করছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ।

রোহিঙ্গা সমস্যাটি স্বাধীন বাংলাদেশের বয়সের চেয়ে পুরনো। রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি আরাকান দীর্ঘ কাল ধরে রোহিঙ্গাদেরই শাসিত ছিল। ১৭৮৫ সালে বর্মী রাজবংশ আগের শাসককে বিতাড়ন করে সমগ্র আরাকান দখল করে নেয়। এক সময়ে সমগ্র বার্মা ব্রিটিশদের শাসনে এলে সেই বর্মী রাজত্বের অবসান ঘটে। সেই সময়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্বতা নিয়ে আরাকানেই বসবাস করছিল।

১৯৪৮ সালে বার্মা যখন ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে তখন আরাকানের মুসলিমরা স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানায়। তখন সেখানের অং সান এই বলে রোহিঙ্গাদের নিবৃত্ত করেন যে- বার্মা ফেডারেশনে তাদের স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি থাকবে। অং সান বার্মার অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী— সান, কারান প্রভৃতি জনগোষ্ঠীকে একই প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ তুলে প্রতিশ্রুত ফেডারেশন কাঠামো অস্বীকার করে। ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রকারান্তরে দেশটি শাসন করছে সেনাবাহিনী। তারা রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিক মনে করে না। তারা বলছে এরা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বর্ধিত অংশ। আরাকান তাদের ভাষায় রাখাইন স্টেট, রাখাইন জাতির বসবাসের জায়গা। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে ওই অঞ্চলে রাখাইনদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। মায়ানমারের অন্য অঞ্চল থেকে রাখাইনরা আরাকানে চলে আসে। আর বিগত সত্তর বছরে বর্তমান সময়ের মতো রোহিঙ্গারা বারবার বিতাড়িত হয়েছে।

মায়ানমার সরকার বিভিন্ন সময়েই নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ১৯৭৮ সালে নিপীড়নের এ রকমই এক পর্যায়ে রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার পর এমনই চলছে বহু বছর ধরে। সেখানে সমস্যা তৈরি হয়- রোহিঙ্গারা বাঁচতে চলে আসেন বাংলাদেশে।

গত ২৫ অগষ্ট রাতে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক সঙ্গে ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসনে সন্ত্রাসী হামলার দাবি করেছে সেই দেশটির সরকার। হামলায় প্রাথমিক ভাবে পাঁচ পুলিশ ও সাতজন মুসলিম রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর পরই নতুন করে শুরু হয় রোহিঙ্গা নিধন। ২৫ অগস্ট থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে গত মঙ্গলবার একটি বিবৃতিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে।

গত বছর ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ মায়ানমারের সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বর্ডার গার্ড পুলিশের ক্যাম্পে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছিল। রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই এই হামলা করে এমন অভিযোগ রয়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য মারাও যান। অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনা ঘটে।
জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে দেশটির উত্তর-পূর্ব রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হিংসা চালাচ্ছে সে দেশের সেনাবাহিনী। জাতিগতভাবে নির্মূল করতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের গ্রামে আগুন দিয়ে বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া-সহ গণহত্যা ও গণধর্ষণ চালায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মায়ানমারকে আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গেই এই সঙ্কটের বিষয়টি রাষ্ট্রসঙ্ঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে তুলবেন বলে বাংলাদেশের সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মায়ানমারকে আন্তর্জাতিক ভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা করবেন তিনি। হাসিনা বলেছেন, ‘আমি রাষ্ট্রসঙ্ঘে অধিবেশনে যাচ্ছি। সেখানে সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেব। নিশ্চয়ই আমার বক্তব্যে মিয়ানমারের বিষয়টি তুলে ধরব।’ রবিবারই শেখ হাসিনা রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা ছেড়েছেন।

সূত্র: আনন্দবাজার

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment