লালনেই দুর্বলতা অঙ্কনের

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর সঙ্গীত চর্চা ছোট বেলা থেকেই। লালন সঙ্গীতেই তাঁর পদচারণা। ফরিদা পারভীনকে ভাবেন নিজের আইডল হিসেবে। প্রথম যে গানটি কণ্ঠে তোলেন সেটি ছিলো- ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’। মোটকথা ফোক গানেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এই শিল্পী। পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিজের কণ্ঠের জাদুতে এরইমধ্যে দেশব্যাপী ছড়িয়েছেন খ্যাতি। বিদেশেও বিভিন্ন কনটেস্টে গান করেছেন। তিনি ফোকশিল্পী অনন্যা ইয়াসমিন অঙ্কন

একুশে টেলিভিশন (ইটিভি) অনলাইনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় অঙ্কন জানালেন গান নিয়ে তার ভাবনার কথা, ভালো লাগার কথা আর ক্যারিয়ারের কথা। তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন- সোহাগ আশরাফ

ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল অঙ্কনের। বাবার প্রতিষ্ঠিত মহানন্দা সংগীত নিকেতনে অঙ্কনের গানের শুরু। সংগীতে তাঁর শিক্ষাগুরু বাবা। মূলত: বাবার হাত ধরেই তাঁর গানের জগতে প্রবেশ। পরিবারের সবাই সুরের সঙ্গে বাঁধা। এক কথায় সবাই গানের মানুষ।

বিষয়টি নিয়ে অঙ্কন বলেন, ‘আমার বাবা গানের মানুষ। আম্মুও গান করেন। আমার ছোট ভাই আছে সেও গান করে। বাবার কাছেই সংগীতে আমার হাতে খড়ি।’

ছোট বেলার গানের স্মৃতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্টেজে ওঠা দলীয় গানে। তখন আমার বয়স মাত্র দুই বছর নয় মাস। আমি তখন ভালো করে গান গাইতে পারতাম না। তারপরেও আমাকে স্টেজে তুলে দেওয়া হতো। আব্বু-আম্মু গান করতেন সেই সুবাদে ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আমারও আগ্রহ তৈরি হয়। ফাইনালি আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখনই গান শুরু করি। ওই সময় থেকেই আমার জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুরু।’

অঙ্কন মাত্র তিন বছর বয়সে শিশু একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত সংগীত অনুষ্ঠানে সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। ২০০৬ সালে বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় দেশাত্মবোধক সংঙ্গীতে প্রথম স্থান এবং একই বছর পদ্মকুড়ির জাতীয় শিশু-কিশোর-যুব প্রতিযোগিতায় লোকসংগীতে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন।

২০০৮ সালে একই প্রতিযোগিতায় আবার জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। ২০০৭ সালে জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় লোকসংগীতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন ও ২০০৯-এর জাতীয় শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় দেশাত্মবোধক ও লোকসংগীতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হন। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন অঙ্কন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার পূর্ব পাঠানপাড়া গ্রামের মেয়ে অঙ্কেন। নবাবগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা সিটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

অঙ্কনের বিশেষ দুর্বলতা ছিলো লোকসংগীতের উপর। এরই ধারাবাহিকতায় আড়ং ডেইরি চ্যানেল আই বাংলার গান ২০১৫ প্রতিযোগিতায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। এই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় রানার আপ নির্বাচিত হন। নতুন করে সেই থেকেই শুরু হয় যাত্রা। এরপর বাবা-মা ও দেশবাসীর অনুপ্রেরণায় ধীরে ধীরে অঙ্কন হয়ে উঠেছেন ফোক অনুরাগী।

বিষয়টি নিয়ে একুশে টিভি অনলাইনকে অনন্যা ইয়াসমিন অঙ্কন বলেন, ‘প্রথম থেকেই আমার টার্গেট ছিলো মাটির গান তথা লালনের উপর গান করবো। আব্বুর একটা বিশাল কালেকশন আমাকে দিয়ে বলেছিলেন, এই লালনের গানগুলো তুমি শোনো আর চেষ্টা করো সুর তুলতে। তিনি আমাকে গানগুলো যত্ন নিয়ে শিখিয়ে ছিলেন। আব্বু আধুনিক গান করেন। সঙ্গে ফোক গানও করেন। আব্বুর ফোক গানের উপর দুর্বলতা আছে। আব্বুর ভালো লাগা আর অনুপ্রেরণাতেই ফোক গানে আসা। তিনি দেখেছেন আমার কণ্ঠের সঙ্গে ফোক ভালো যায়। আমারও গাইতে ভালো লাগে। মূলত লালনের গান থেকেই আমার আসা। এককথায় আমি লালন গীতিটাই বেশি পছন্দ করি। লালন গাইতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি। লালন নিয়েই থাকতে চাই।’

অনন্যা অঙ্কন ভারতের কলকাতায় জি বাংলা সা-রে-গা-মা-পা প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া আবদুল আলীম ফাউন্ডেশন আয়োজিত ও বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সহযোগিতায় ইউনেস্কো পার্টিসিপেশন প্রোগ্রাম ২০১৪-২০১৫-তে অংশ নেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ বেতারে লোকসংগীতের নিয়মিত শিল্পী।

এখনও কোনো একক অ্যালবাম প্রকাশ না পেলেও প্রস্তুতিটা এগিয়ে রেখেছেন অঙ্কন। একুশে টিভি অনলাইনকে অঙ্কন বলেন, ‘অ্যালবাম নিয়ে কথা বলার আগে একটা কথা বলে নিই। সেটি হচ্ছে- ২০১১ সালের দিকে আমি কলকাতায় জি বাংলা সা-রে-গা-মা-পা প্রতিযোগিতায় অংশ নিই। যেখানে ফোক শুধু না, আমাকে ভার্সেটাইল দেখাতে হয়েছে। ওখানে আমাকে হিন্দি গানও গাইতে হয়েছে। তাছাড়া সব ধরণের গানতো একজন শিল্পীকে করতেই হয়। সেটা তার ভার্সেটাইলিটি। প্রত্যেক শিল্পীর তো এক একটা ধরা থাকে। এই নামটার জন্য আমার আসলে ফোকের দিকে চলে আসা। আমি নিজেকে একজন ফোক শিল্পী হিসেবে দেখতে চাই।

এবার আসি অ্যালবামের কথায়। আমি সলো অ্যালবাম নিয়ে কাজ করছি। অ্যালবাম যেটা করছি সেটা হচ্ছে- রবিউল ইসলাম জীবন ভাইয়ের কথায়, মিলন মাহমুদের সুরে। এটার কম্পোজিশন করেছেন এম এম পি রণি। তিনটা গান নিয়ে একটা অ্যালবাম হচ্ছে। এর মধ্যে একটা গানের মিউজিক ভিডিও হবে। ইতিমধ্যে দুটি গানে ভয়েস দেওয়া হয়েছে। শেষ গানটি বাকি আছে এখনও। আশা রাখি গানগুলো রিলিজ হবে এ বছরের শেষে অথবা আগামী বছরের শুরুতে।

অঙ্কন নিয়মিত স্টেজ শো করছেন। বছরের এই শেষ সময়ে অর্থাৎ নভেম্বর, ডিসেম্বরে স্টেজ শো বেশি থাকে। নতুন বছরের শুরুর দিকেও অনেক শো থাকে।

এ বিষয়ে অঙ্কন বলেন, বর্তমানে স্টেজ শো নিয়ে একটু ব্যস্ততা আছে। সামনে শো করতে যমুনা ক্যান্টনমেন্ট সিরাজগঞ্জে যাচ্ছি। এরপর যাবো চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এছাড়া র‌্যাব, পুলিশের অনুষ্ঠানগুলো বেশি করা হয়।

টেলিভিশনে গানের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নাটক-টেলিফিল্মেও গান করেন অঙ্কন।

অঙ্কনকে অনেকে এখন উত্তরবঙ্গের গর্ব মনে করেন। লালনকন্যা হিসেবেই তিনি খ্যাতি পাচ্ছেন। জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে অসংখ্য স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। একাধিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন থেকে পেয়েছেন সম্মাননা স্মারক।

অঙ্কনের সামনে এখন একটাই মিশন-নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চান গানের মধ্যেমে। প্রতিষ্ঠা পেতে চান ফোক শিল্পী হিসেবে। গেয়ে যেতে চান মাটির গান।

এ প্রসঙ্গে তার একটাই কথা- ‘আমি মারা গেলে যেনো আমার গানগুলো থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে।’সুত্রঃ ইটিভি অনলাইনে


Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment