রাজনীতিবিদদের আদর্শিক দৈন্যতার কারণে বিতর্কীত পুলিশ

বৃটিশরা তাদের নিজ বাসভূমে মেট্রোপলিটন পুলিশের মত সুসজ্জিত আধুনিক পুলিশ বাহিনীর সূচনা করে। সে পুলিশ বাহিনী ছিল জনগনের সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ সরকারের ভাল মন্দ কাজ-কর্মের দায়ভার থেকে মুক্ত। একথা পরিস্কার যে, বৃটিশরা যে উদ্দেশ্যে আমাদের দেশে পুলিশ বাহিনী গঠন করেছিল তার সাথে যে কোন আধুনিক রাষ্ট্রের পুলিশের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। ১৯৪৭ সালে বৃটিশরা ফিরে গেলে শুরু হয় পাকিস্তান আমল। পাকিস্তান আমলও চলতে থাকে অনেকটা বৃটিশ স্টাইলে। বর্গীদের আমল শেষ হলেও বৃটিশদের সে ধারা থেকে আমরা পুরোপুরি বের হতে পারিনি। কাগজে কলমে অনেক পরিবর্তন বা আধুনিকায়নের কথা, জনসেবা বা জনগনের বন্ধু হওয়ার কথা থাকলেও কেন জানি তার বহিঃপ্রকাশ তেমন দেখা যায় না।

জানা গেছে প্রধানত পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে একটি খসড়া আইন বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে জমা আছে। আইনটি সম্পর্কে বিস্তারিত না জানলেও পুলিশের নিয়ন্ত্রনগত পদ্বতির পরিবর্তন আনার চেষ্টা হচ্ছে বোঝা যায়। বিষয়টা ইতিবাচক। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা সংগতকারণেই সমর্থনযোগ্য। কিন্তু পুরোপুরি বাঁধনহারা করার আগে অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত হিসাবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন দেশের রাজনীতিবীদদের সদিচ্ছা ও শক্তিশালী গণতন্ত্র চর্চার।

দেশের আভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃংখলা রক্ষা করার গুরু দায়িত্ব প্রধানত পুলিশ বাহিনীর উপর ন্যাস্ত। অনেক ভালো কাজ করলেও দুঃখজনকভাবে ঘুস আর চাঁদাবাজির তকমার নীচে ঢাকা পড়ে যায় বাংলাদেশ পুলিশের কৃতিত্ব। সাম্প্রতিক কালে থানা-হাজতে আসামির মৃত্যু, ঝুলিয়ে নির্যাতন, ধর্ষণ বা রিমান্ডের নামে অযাচিত নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

পুলিশকে ঘিরে মাঝে মধ্যেই ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ বা ‘সরষের ভেতরে ভূত’ টাইপের শিরোনামে খবর দেখা যায়। পুলিশের ভালো কাজের প্রশংসার খবর একেবারে দেখা যায় না, এমনও নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে পুলিশের গৌরবময় অবদানের কথা আমরা কমবেশী জানি। জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের যথেষ্ঠ সুনাম রয়েছে। তারপরও সার্বিকভাবে পুলিশের প্রতি অধিকাংশ সাধারণ মানুষের রয়েছে নেতিবাচক মনোভাব। বিপদের বন্ধূর কাছে গিয়ে আরো বিপদে পড়ার ভয় অনেকের মধ্যে। অনাকাঙ্খিত বর্তমান এ অবস্থার পেছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আমরা পুলিশকে বর্তমান অবস্থায় আসতে উৎসাহিত করেছি। অনেকটা বাধ্য করা হয়েছে- বলা যায়। ব্যক্তি হিসেবে একজন পুলিশের দোষের চেয়ে পদ্ধতিগত বা রাজনৈতিক জটিলতা ও রাজনীতিবিদদের আদর্শিক দৈন্যতার জন্যই প্রধানত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ।

রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দৃশ্যত কিছু সুবিধাবাদী আর অপরাধীরাই পুলিশের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলছেন। অরাজনৈতিক কমিউনিটি পুলিশং কমিটিও রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত নয়। প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরাই কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির নেতৃত্বে।

চাঁপানবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে বাংলাদেশ পুলিশ প্রধান আইজিপি শহীদুল হক বলেন শুধু আইন দিয়ে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়, প্রয়োজন জনসম্পৃক্ততা। কমিউনিটি পুলিশিং শুধুমাত্র একটি সংগঠন হিসেবে নয় দর্শন স্থাপন করবে যাতে যুগ যুগ ধরে জনতা আর পুলিশের মাঝে সম্পর্ক অটুট থাকে।

পুলিশের কাছে অপরাধীর কোন প্রশ্রয় নেয়। তবে জনপ্রতিনিধিদের মুল্যয়ন করতে বলছে পুলিশ আইন। আইনের চোখে অপরাধী, সন্ত্রাসী আর চোরাকারবারিরা যখন জনগনের ভোটে নির্বাচিত হন সরল অংকের সমাধান জটিল হয়ে পড়ে। কেনোনা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই পুলিশের নিয়ন্ত্রক।
দেশের মিডিয়া আর মানবাধিকার সংগঠনগুলো যত সহজে পুলিশের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাননা।

উৎপত্তি ও উদ্দেশ্যগত দুই ক্ষেত্রেই পুলিশ ছিল জনগনের আশা আকাঙ্খার বিপরীত। ক্রমেই আমাদের সাথে মিশে যায় রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যাক্তি হিসেবে পুলিশকে দিয়ে বিরোধীমত দমনের প্রবনতা, পুলিশ হিসেবে অত্যাচার করার প্রবনতা বা জনগন হিসেবে অত্যাচারিত হওয়ার ভয়। সে সময় জনসাধারণের কাছে পুলিশ হয়ে ওঠে অত্যাচারের প্রতিক। আজো অনেক সময় বাচ্চাদেরকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ানো, খাওয়ানো বা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য কোন কাজ করানো হয়।

লেখকঃ ফারুক আহমেদ চৌধুরী
গণমাধ্যম কর্মী


Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment