নির্ভরযোগ্য ডায়াগনষ্টিক রিপোর্ট কোথায় পাবেন?

0

ফিচার ডেস্কঃ বর্তমানে কেউই কোন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের রিপোর্ট এ ভরসা পান না, হোক সে জনগন কিংবা ডাক্তার! একে তো রোগীর লোকজন অপ্রয়োজনীয় টেষ্ট কিংবা ডাক্তারের কমিশন খাবার বাহানা ভেবে ডায়াগনষ্টিক টেস্ট কে অবহেলা করে থাকেন, অপরদিকে ডাক্তারগন ও অস্বস্তিতে থাকেন কারন অদক্ষতা ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যাবস্থাপনার কারনে একই স্পেসিমেনের রেজাল্ট বিভিন্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টার বিভিন্ন রকম দেয়, এমতাবস্থায় ভালো ডায়াগনষ্টিক সেন্টার চিনতে আপনার-আমার কিংবা ডাক্তারের করণীয় কী সেটাই আজকের আলোচ্য বিষয়।

আগেকার দিনে রোগীর দেহের তাপমাত্রা, নাড়ির গতি, জিহবার রং, হাঁটাচলা দেখে রোগ নির্ণয় করা হলেও এখনকার দিনে এমনটা করলে তা হাস্যকর বিষয় হয়ে দাড়াবে। যদিও বর্তমানে রোগ নির্ণয় করা সঠিক ডায়াগনস্টিক রিপোর্টের উপর অনেকাংশেই নির্ভর করতে হয়। তারপরও-প্রকৃতপক্ষে রোগ নির্ণয়ের পূর্বশর্ত হল রোগীর সঠিক রোগের ইতিহাস, ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন এবং সর্বশেষে ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট। এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও ফলোআপ করা বর্তমানে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

সুতরাং রোগী ডাক্তার দেখালে, তিনি রোগের তথ্য জানতে চান, শারিরিক পরীক্ষা করে একটা ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস দাড় করান। ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিসের ওপর নির্ভর করে তিনি রোগীদের প্যাথলজি টেষ্ট বা ইমেজিং এ্যাডভাইস দেন। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর জন্য রোগী তার নিজের কিংবা ডাক্তারের পছন্দমতো কোন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে যান। এক্ষেত্রে আপনি কোনো ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে পরীক্ষার জন্য গেলে নিচের জিনিসগুলো অবশ্যই লক্ষ করবেন এবং আশ্বস্ত হলে পরীক্ষাগুলো করাবেন-অথবা করাবেন না।

রিসেপশন কাউন্টারে বিনয়ী কর্মী, ওয়েটিং এর যায়গায় পর্যাপ্ত আসন, পরিছন্ন বাথরুমের সুবিধা, আপডেট লাইসেন্সের কপি ও সার্ভিসের মূল্য তালিকা টানানো, সঠিক দিকনির্দেশনামূলক চিন্হ, রুম নম্বর ও রুমের পরিচিতি দেয়া থাকবে। অনেক লাইসেন্স বিহীন প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত মুল্য সম্বলিত তালিকা টানিয়ে দেদারসে ব্যাবসা করে।

প্যাথলজি রিপোর্ট অথারাইজড করতে প্যাথলজিস্ট, ল্যাব-সায়েন্টিস্ট, বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও প্যাথলজির নমুনা সংগ্রহ ও কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদন করতে ডিপ্লোমাধারী দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ান থাকবে। অনেক জায়গায় সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের নাম, ঠিকানা ও কাগজপত্র থাকলেও তাদের উপস্থিতি ছাড়াই সকল কার্যক্রম চলে।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি নিয়ে সবারই কম-বেশী ভুল ধারণা আছে। এই ভুল ধারণা রোগীর জন্য ক্ষতিকর এবং কিছু প্রতারক ব্যবসায়ীর অবৈধ আয়ের হাতিয়ার ও বটে। 2D/3D/4D/ ডপলার নিয়ে ডায়াগনষ্টিক মালিকদের অহেতুক প্রচারনা এখন তুঙ্গে তাই এ ব্যাপারে সকলেরই সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। আল্ট্রাসনোগ্রাম আধুনিক কালের একটি কার্যকরি ইনভেষ্টিগেশান এবং স্বাভাবিক ভাবেই আল্ট্রাসনোগ্রাফির ভার্শন (2D/3D/4D/ডপলার) যত উন্নত, ইনভেষ্টিগেশান কোয়ালিটি তত বেশি আপগ্রেডেড এমন ভুল ধারনার বশবর্তী হয়ে অনেক রোগী অপেক্ষাকৃত বেশী খরচে সর্বশেষ ভার্শনের আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে আগ্রহী হন, এমন সুযোগে এক শ্রেনীর প্রতিষ্ঠান মালিক 2D আল্ট্রাসনোগ্রামের কালারফুল ছবি দিয়ে 4D আল্ট্রাসনোগ্রাম বলে চালিয়ে দিয়ে বেশী টাকা আদায়ের ফন্দি করে, প্রকৃত সত্য হলো, 4D আল্ট্রাসনোগ্রাম করার জন্য টেনিসবল আকৃতির যে ব্যায়বহুল প্রোব লাগে সেটা তাদের মেশিনে থাকেই না তাছাড়া 2D/3D/4D/ডপলার এগুলো একটির চেয়ে অন্যটি ভালো মানের পরীক্ষা, বিষয়টি এমন নয় বরং প্রত্যেকটির আলাদাভাবে বিশেষ উপযোগীতা রয়েছে। যেমনটি আপনার প্রয়োজন সেটি প্রকৃত ডাক্তারগনই নির্ধারন করে দেন।

এক্স-রে নিয়ে আছে আরেক ভুল বোঝাবুঝি, অনেক সিআর (কম্পিউটেড রেডিওগ্রাফী) সিস্টেম এক্স-রে ওয়ালা ডায়াগনস্টিকগুলো রোগীর উদ্দেশ্যে, এ্যানালগ নাকি ডিজিটাল? এমন প্রশ্নবোধক ডিজিটাল প্রচারনা চালিয়ে ফায়দা লুটতে চেষ্টারত থাকেন, আসলে এই সিআর সিস্টেম এক্স-রে র বিশেষ কোন বিশেষত্ব নাই, সাধারন এ্যানালগ এক্স-রে তে সরাসরি ফিল্মে এক্স-রে প্রয়োগ করে পরবর্তী ধাপে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ছবি তৈরী করা হয় যা সময়সাধ্য তাই আধুনিক কালে সময় বাঁচাতে সরাসরি ফ্লিমের বদলে এক ধরনের ক্যাসেটে এক্স-রে প্রয়োগ করে সেই ক্যাসেটের ছবি রিডার নামক যন্ত্রের মাধ্যমে কম্পিউটারে প্রবেশ করানো হয় তারপর প্রিন্টারের সাহায্যে ফ্লিম প্রিন্ট করা হয় কিন্তু এটা প্রকৃত ডিজিটাল এক্স-রে নয়। ডিআর (ডিজিটাল রেডিওগ্রাফী) সিস্টেম এক্স-রে হলো প্রকৃত ডিজিটাল এক্স-রে, এই সিস্টেমে এক্স-রে প্রয়োগের পর ছবি সয়ংক্রিয়ভাবে কম্পিউটারে চলে যায় এবং প্রিন্টারের সাহায্যে প্রিন্টেড ফ্লিম বের হয়ে আসে।

বিষয়গুলোর খোঁজ নিয়ে আপনি সন্তুষ্ঠ হলে, রিসেপশনে ডাক্তারের এ্যাডভাইস জমা দিয়ে মানি-রিসিট নিয়ে লক্ষ রাখবেন ডাক্তার যেসব পরীক্ষার উপদেশ দিয়েছেন তা সঠিকভবে তোলা হয়েছে কিনা এবং তালিকা মোতাবেক মূল্য রাখা হয়েছে কিনা।

আশা করি আপনার সচেতনতা সবার জন্য নির্ভরযোগ্য ডায়াগনষ্টিক রিপোর্ট নিশ্চিত করবে।

লেখক পরিচিতিঃ
তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিন মেডিসিন ফ্যাকাল্টির ২০০৪-০৫ শেষনের মেধা তালিকায় ১ম স্থান অর্জন সহ এ্যাফিলিয়েটেড আইএমটি থেকে ২০০৯ সালে ল্যাবরেটরি মেডিসিনে গ্রাজুয়েশন ও ২০১৫ সালে প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে মাইক্রোবায়োলজী তে পোষ্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ বিষয়ে রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত আছেন।
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ