কথা বলছে না মাহি, ভুলে গেছে কান্না

0

চৌদ্দ বছরের কিশোর তানজিদ সুলতান মাহি। জীবনের কঠিন বাস্তবতা কী, জানতো না এতোদিন। একটি দূর্ঘটনা হঠাৎ করেই তাকে আছড়ে ফেলেছে কঠিন বাস্তবতায়। ১১ দিন আগে বাবা ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান নিহত হন নেপালের বিমান দূর্ঘটনায়। এর ১১ দিন চলে যান মমতাময়ী মা আফসানা খানম। এমন কঠিন বাস্তবতায় কি করতে পারে ছোট্ট এই কিশোর? নির্বাক, হতভম্ব আর শোকে পাথর হয়ে গেছে সে। শোকে স্তব্ধ মাহি কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছে না, এমনকি কান্নাও করছে না।

শুক্রবার সন্ধ্যায় মা আফসানা খানমের কফিন যখন শেষ বারের মতো খোলা হচ্ছিল তখন মায়ের মুখের দিকে পাথর চোখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে ছেলে মাহিকে। উপস্থিত স্বজনদের সঙ্গে মাহির এই নির্বাক তাকিয়ে থাকা যেন সহস্র কথাই বলে।

বাবা নিহত হওয়ার খবর শুনে মা আফসানা খানম কোনো কান্না করেনি। চোখের পানি না ফেলেই শক্ত ছিলেন। হয়তো ছেলে ভেঙে পড়বে এমনটা মনে করে শক্ত ছিলেন। ওই সময় মাহির মা আফসানা খানম শুধু বলেছিলেন, যা হারাবার হারিয়েছি, তা কোনো দিন পূরণ হওয়ার মতো নয়।

মায়ের মৃত্যুতেও মাহি উচ্চ স্বরে কান্না করেনি। বরং মায়ের মতো শক্তই ছিলেন। শুধু নির্বাক তাকিয়ে মায়ের নিথর মরদেহ দেখছিলেন আর কি যেন ভাবছিলেন। হয়তো ভাবছিলেন, সামান্য কটা দিনের ব্যবধানে বাবা মা দুজনই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। একা রয়ে গেলাম আমি। এভাবেই বলছিলেন মাহীর স্বজনরা।

শুক্রবার বিকেল সোয়া ৫টায় রাজধানীর উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে গাউসুল আজম জামে মসজিদে আফসানার জানাযা সম্পন্ন হয়। এরপর তার মরদেহ বনানী সামরিক কবরস্থানে নিয়ে স্বামী ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

আফসানার ফুফাতো ভাই খন্দকার রেজাউল করিম বলেন, মাহি চুপ করে আছে। কাঁদলে মন হালকা হতো। আবিদের মৃত্যুসংবাদ পেয়েও তার স্ত্রী আফসানা কাঁদেননি। শক্ত হয়ে ছিলেন। মায়ের স্ট্রোকের সময় মাহি পাশে ছিল। এখন ছেলেকে নিয়েই তাদের যত চিন্তা।

সম্প্রতি নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজটির পাইলট ছিলেন আবিদ। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তার স্ত্রী আফসানা। প্রথমে তাকে বলা হয় আবিদ আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। পরে স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে আফসানা ভেঙে পড়েন। স্বামীর শোক সইতে না পেরে স্ত্রী আফসানা খানমও ব্রেন স্ট্রোক করেন ১৮ মার্চ। আফসানার মস্তিষ্কে দুবার রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক) হয়ে ছিল। প্রথমবার ছিল মৃদু, পরেরটি গুরুতর। নেয়া হয় নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে। সেখানে তার মাথার খুলির একটি অংশ খুলে রাখা হয়েছিল। এভাবেই তার চিকিৎসা চলছিল। অবশেষে জীবনের কাছে হার মেনে শুক্রবার সকালে না ফেরার দেশে চলে গেলো আফসানা খানম। একমাত্র ছেলে মাহী বাবা নিহত হওয়ার সময় কাছে না থাকলেও মায়ের স্ট্রোকের সময় পাশেই ছিলেন।

রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আফসানা। ওই হাসপাতালের আইসিইউর চিকিৎসা কর্মকর্তা কাজী একরাম হোসেন জানান, আবিদের স্ত্রীর অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল। শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তিনি মারা যান।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মাহি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দেবে। পাইলট আবিদ বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের বৈমানিক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁর রানীনগরে। আবিদের বাবা এমএ কাশেমও ছিলেন বৈমানিক। অন্যদিকে আফসানার গ্রামের বাড়ি নাটোরে। তার বাবা কাশেম শেখ একজন চিকিৎসক। একমাত্র ছেলে মাহিকে নিয়ে আবিদ-আফসানা দম্পতি উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৮ নম্বর বাসায় থাকতেন।

স্বজনরা জানান, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর এখন মাহি তার চাচা খুরশিদ মাহমুদের কাছে থাকবেন। খুরশিদ মাহমুদ একজন চিকিৎসক। তিনি পরিবার নিয়ে পল্লবীতে থাকেন। ১২ মার্চ কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। উড়োজাহাজের ৭১ আরোহীর মধ্যে ৫১ জন নিহত হন। আর আহত হন ২০ জন। নিহতদের মধ্যে বিমানের পাইলট, কো-পাইলট ও দুজন ক্রুসহ বাংলাদেশের ২৬ জন, নেপালের ২৪ জন ও চীনের একজন। এছাড়া আহতদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি, নয় জন নেপালের ও একজন মালদ্বীপের নাগরিক।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ