মার্কিন চাপে বাংলাদেশ

0

উত্তর কোরিয়ার ওপর ‘অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ’ সংক্রান্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্ত অতিসত্বর বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর দেশটি বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়েছে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকা শাখা ওই চিঠি গ্রহণ করেছে। চিঠিতে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আর্থিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদের এ সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য বলেও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যকরে পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে বলেও চিঠিতে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওই চিঠিতে বলা হয়, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ থেকে সরে আসতে উত্তর কোরিয়াকে জাতিসংঘ বারবার চাপ দেয়া সত্ত্বেও তারা কিছুতেই আমলে নিচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রকরণে বাধ্য করতে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাষ্ট্র এ সংক্রান্ত রেজুলেশন ২৩৯৭ উত্থাপন করে, যা নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ রেজুলেশন কার্যকর করতে বাধ্য। চিঠিতে আরও বলা হয়, শুধু বাংলাদেশই নয়, জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত প্রতিটি দেশকেই আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) এ অনুরোধ সংবলিত কূটনৈতিক চিঠি দিয়েছি। উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষেত্র সম্প্রসারণে যেসব সুযোগ রয়েছে, তা বন্ধ ও বর্জনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি অন্যান্য দেশকেও বারবার বলে আসছি।

চিঠিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, এ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ উত্তর কোরিয়ার অবৈধ কার্যক্রমের সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এ ধরনের নিষিদ্ধ ও অবৈধ তৎপরতা রোধে সহায়ক কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সব ধরনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আর্থিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসে এ সম্পর্কিত আইন ও বিধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ দেশটিতে (উত্তর কোরিয়া) যাতায়াত ও পণ্য আমদানি-রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে বলেও আশা প্রকাশ করা হয়। এছাড়া দেশটির সরকার ও অর্থনীতিতে সুযোগের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন সব সম্পত্তি জব্দ করার কথাও বলা হয়।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেন, ‘আমরা এ ধরনের একটি কূটনৈতিক পত্র পেয়েছি। এ ব্যাপারে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হলে জানতে পারবেন।’

তবে দায়িত্বশীল একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য, অর্থ, শিল্প, স্বরাষ্ট্র, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এনবিআরের মতামত চাওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত আধা-সরকারি পত্র (ডিও) দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই ডিওতে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতভাবে জোরালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে অনুযায়ী উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সব ধরনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা মূল্যায়ন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে অনুরোধ করা হচ্ছে। সূত্র আরও জানায়, প্রভাব মূল্যায়নের পর এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও মার্কিন সরকারের কূটনৈতিক চিঠির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত চাওয়া হবে। এরপরই উত্তর কোরিয়ার ওপর অবরোধ আরোপে বাংলাদেশের অবস্থান জানা যাবে।

বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু বলেন, ‘অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হবে কি হবে না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে তারা (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) সম্প্রতি এ ইস্যুতে একটি ডিও পাঠিয়েছে। সেটি পাওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট শাখাকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিসহ সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থান নির্ধারণ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এটি পাওয়ার পর আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠিয়ে দেব।’

তবে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে প্রভাব মূল্যায়নের কাজ শেষ করেছে। এ সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে ২০১১-১২ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আমদানি-রফতানির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ওই ৬ অর্থবছরের আমদানির পরিমাণ উল্লেখ করা হয় যথাক্রমে ৪১.৬, ১৩.৯, ৫২.০, ৩৮.১, ৫.৭ ও ৪.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একইভাবে ওই বছরগুলোয় বাংলাদেশ থেকে উত্তর কোরিয়ায় রফতানি হয় যথাক্রমে ০.২১, ০.১৯, ০.২৩, ০.২৮, ০.০৩ ও ০.৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে দেখা যায়, দেশটি থেকে বাংলাদেশের শুল্ক লাভের পরিমাণ যথেষ্ট কম। ব্যক্তি উদ্যোগেই সাধারণত দেশটির সঙ্গে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চলছে। সেখানে বাজার খোঁজার জন্য বাংলাদেশের স্থায়ী কোনো মিশনও নেই। মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যবসায়ী দেশটি থেকে তুলা, প্লাস্টিক সরঞ্জাম, পেপার ও পোরবোর্ড, রিঅ্যাক্টর, বয়লার মেশিনারি ও ডায়িং মেশিনারি আমদানি করে থাকে। এছাড়া প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, উত্তর কোরিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যাও খুব বেশি নয়।
সূত্র: যুগান্তর

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

ব্রেকিং নিউজঃ