মুক্তিযুদ্ধ শেষে এখন সমাজ পরিবর্তনের যুদ্ধ করছি

0

গ্রাম আদালতের একজন দক্ষ বিচারক চাঁপাইনবাগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান টুরু। ৭০ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধার রয়েছে বিভিন্ন বয়সী ভক্ত। শেষ বয়সে এখনও করে চলছেন সমাজ পরিবর্তনের যুদ্ধ। মাদকের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রনে মাদক নির্মূল কমিটি করে প্রতিনিয়ত চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের তুলে দিচ্ছেন পুলিশের হাতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সেকশন কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চাঁপাইনবাগঞ্জের সদর উপজেলা কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেনন তিনি। এমনই এক ক্লান্তিহীন সমাজ সেবক, মহানুভব বীর মুক্তিযোদ্ধার সাথে আলাপচারিতায় সিএন ক্রাইম নিউজের  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফারুক আহমেদ চৌধুরী

সিএন ক্রাইম নিউজ : আপনার সম্পর্কে জানতে চাই?
আব্দুর রহমান : আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ শেষে এখন সমাজ পরিবর্তনের যুদ্ধ করছি। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ বাঙালির আত্মাহুতির মধ্যদিয়ে কাঙ্খিত সেই মহান স্বাধীনতা অর্জন। কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে বিজয়ের ৪৬ বছরেও আমরা অর্থবহ করতে পাররিনি। এটাই আজ আমাদের বড় আক্ষেপ ও পরিতাপের বিষয়। পাকিস্থানিদের তথাকথিত শাসনের নামে চলা শোষণ থেকে মুক্তি পেতে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করি । এখন সমাজ সংস্কারের কাজে নিয়োজিত । প্রত্যাশিত বাংলদেশ গড়ে তুলতে যতদিন সম্ভব যুদ্ধ করে যাবো।
শেয়ার বিজ: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে কিছু বলুন?

আব্দুর রহমান: পাকিস্থান আমলে চার বছর মোজাহিদ ট্রেনিং করেছিলাম। যুদ্ধকলীন সময়ে ভারতের শিলিগুড়িতে এক মাস সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহন করি। সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহনের পর কানসাটের ধোবড়া থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করি। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপটেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে দীর্ঘ ছয় মাস যুদ্ধের ময়দানে ছিলাম। হঠাৎ পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী ধোবড়া মুক্তিসেনাদের ক্যম্প ঘিরে ফেলে। ক্যাপটেন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে আমরা আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করে সোনামসজিদ সংলগ্ন আমবাগানে মৌর্চাতে আশ্রয় নিয়ে আবারও যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করি। সোনামসজিদের অস্থায়ী ক্যম্পে দুই জন দালাল ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গির ওস্তাদকে বলেন ধোবড়া ক্যাম্পে মাত্র ৩ জন পাকিস্থানি সৈন্য রয়েছে। সরল বিশ্বাসে ওস্তাদ জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে বেলা সাড়ে এগারো টার দিকে ১২৫ জন মক্তিযোদ্ধা ধোবড়া ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। ক্যাম্পের পাশে যেতেই ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। প্রায় দুইশতাধিক পাকিস্থানি সৈন্যের সাথে আমাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে তিন জন মুক্তিসেনা নিহত ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার রামকৃষ্টপুর মহাল্লার নজরুল ইসলাম গুরুতর আহত হয়। ঐ দিন আমার সহযোদ্ধা সোহরাব আলি আর আমি সন্ধ্যার সময় টাকশাল দীঘির পাশে নিম গাছের আড়ালে দাড়িয়ে আমার কাছে থাকা এলএমজি ও সোহরাব এর কাছে থাকা টাকডুম এসএলআর দিয়ে প্রায় ৪০রাউন্ড গুলি নিক্ষেপ করি। ঐ সময় ৪ পাকিস্থানি সেনা নিহত ও ২জন আহত হয়। সহযোদ্ধা সোহরাব টাকশাল দীঘির দিকে আর আমি পাশের গ্রামে চলে যাই। গুলির শব্দে কান অবেশ হয়ে যায়। প্রায় ৪দিন কানে কিছুই শুনতে পাই নি। দিক হারিয়ে প্রায় ২ দিন ক্যম্প খুজে পাইনি। ক্যাম্পের রোলকলে উপস্থিত না পেয়ে আমাকে মৃত ধরে নেওয়া হয়। এর পর আমি আমার সহযোদ্ধাদের সাহায্যে ক্যাম্পে ফিরে যায় । এর ফাঁকে সম্মুখ যুদ্ধে আহত সহযোদ্ধা নজরুল ইসলাম কে দেখতে যাই মহাদিপুর হাসপাতালে। ফিরে এসে আবারও ক্যাম্পে যোগদান করি। আমাকে সেকশন কমান্ডার হিসেবে একটি গ্রুপের নেতৃত্বে আর শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর অন্য গ্রুপের নেতৃত্বে যুদ্ধ করতে থাকি। ১৪ ডিসেম্বর রেহাইচর এলাকায় ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। সম্মুখ যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করে ১৫ ই ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জকে হানাদার মুক্ত করি।

সিএন ক্রাইম নিউজ : কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?

আব্দুর রহমান: অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, সুখী, সমৃদ্ধ ও জঙ্গিবাদমুক্ত সোনার বাংলা দেখতে চাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চলমান বাংলাদেশ আজ বিশ্বব্যাপি প্রসংশিত। প্রত্যশা করি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ।

সিএন ক্রাইম নিউজ : স্বাধীন বাংলাদেশে কোন সমস্যাটা জটিল মনে করছে?

আব্দুর রহমান: মাদকের ভয়াবহতা, যুবসমাজের অধপতন ও মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে বাংলাদেশে। যা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানে স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আরএ একটি বড় সমস্যা বেকারত্ব । শিক্ষিতরা বেকার থাকলে অপরাধ প্রবনতা বাড়বে। মাদকের বিস্তার ও বেকারত্ব বর্তমান সময়ের সবচাইতে জটিল সমস্যা বলে মনে হয়।

সিএন ক্রাইম নিউজ : তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন?

আব্দুর রহমান : অনেক কষ্টের অর্জন মহান স্বাধীনতা। এটি রক্ষা করার দ্বয়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। মুল বিষয় দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই আজ বাংলার মানুষ ডিসি, এসপি আর এমপি মন্ত্রী হচ্ছে। দেশ স্বাধীন না হলে গুরুতপূর্ণ পদে নয় দারোয়ান হয়ে থাকতে হতো বাঙ্গালীদের। তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে থাকুক লাল সবুজের বাংলাদেশ ভুলে না যাক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ