চাঁপাইনবাবগঞ্জে মিষ্টির কারবার : দিন দিন বেড়ে চলেছে মিষ্টির চাহিদা

0

ডি এম কপোত নবী

মিষ্টি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। বাঙালির জন্মে মিষ্টি, মৃত্যুতে মিষ্টি, মিলাদে মিষ্টি, পূজায় ও যে কোন সুখবরেও মিষ্টি। ভাল কোন কিছু হলেই মিষ্টি দিয়ে শুখ মিঠা করা হয়। প্রতিটি ঘরেই আছে এ রেওয়াজ। মিষ্টি তো সবাই খায় আর পছন্দ করে। কিন্তু এর পেছনের কারিগরদের খবর কি আমরা জানি কখনও? কত নিখুত আর পরিশ্রম করে তাঁরা মিষ্টি বানায়। শীতকালে তেমন সমস্যা না হলেও গরম কালে কষ্টটা বেশি বেড়ে যায় মিষ্টির কারিগরদের। কারণ বড় বড় চুলার পাশে আগুনের তাপ সহ্য করে কারিগরদের মিষ্টি বানানোর কাজ করতে হয়। প্রতিদিন তাঁরা এ কাজ করে চলেছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরেও রয়েছে নানা রকম মিষ্ঠান্নর দোকান। কিছু দোকানের মালিক তো বংশগত ভাবেই এ মিষ্টির ব্যবসার সাথে জড়িত। শহরে যেমন নবাব মিষ্টান্ন ভান্ডার, আলাউদ্দিন হোটেল, শাহ্জাহান হোটেল, তামান্না মিষ্টান্ন ভান্ডার, কাইয়ুম মিষ্টান্ন ভান্ডার, সেলিম মিষ্টান্ন ভান্ডারসহ আরো অনেক মিষ্টির দোকান রয়েছে। আর শিবগঞ্জের আদি চমচম মিষ্টির দোকান তো আছেই। তাঁরাও বংশগত ভাবে মিষ্টির ব্যবসার সাথে জড়িত।

একটি মিষ্টির দোকানের গল্প বলি। দোকানের নাম কাইয়ুম মিষ্টান্ন ভান্ডার। মিষ্টির দোকান না বলে মিষ্টিকেন্দ্র বলাই সংগত। কেননা এখানে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। লম্বা বিশাল কাচের বাক্সে ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে মিষ্টির নমুনা সাজানো রয়েছে।

মিষ্টির ইতিহাস আছে, ভূগোল আছে, ঐতিহ্য আছে। মিষ্টি বাঙালির সৃষ্টি। তবে ইতিহাস বলছে, বাঙালিরা ছানা তৈরি করতে জানত না। আগে মিষ্টি বলতে বোঝাত চিনির ঢেলার সন্দেশ। কখনো তার সঙ্গে নারকেলের মিশ্রণ। পশ্চিমবঙ্গের ব্যান্ডেলের ডাচ কারিগরেরা বাঙালি কারিগরদের ছানা তৈরি করতে শিখিয়েছিলেন। ওপার বাংলার মিষ্টিশিল্পের অনেক রবীন্দ্রনাথ তাঁদের সৃজন প্রতিভার গুণে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। সন্দেশের স্থপতি নকুড় নন্দী, রসগোল্লার কলম্বাস নবীন দাস কিংবা বিশ্ববিদিত ভীম নাগেরা একাধারে ছিলেন মিষ্টির কারিগর ও ব্যবসায়ী।

এ কারণেই সম্ভবত এসব মিষ্টির সঙ্গে তাঁদের নাম জড়িয়ে আছে। কিন্তু বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির নাম পরিচয় ভৌগোলিক। যেমন, রাজবাড়ীর চমচম বা নাটোরের কাঁচাগোল্লা কিংবা মণাকষার প্যাড়া বা আদি চমচম। নিজস্ব কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সে সব মিষ্টি।

বাংলার মিষ্টিতে ঐতিহ্যবাহী যেসব মিষ্টি পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে যশোরের জামতলার রসগোল্লা ও চমচম, খুলনার মিহিদানা লাড্ডু, রাজবাড়ীর চমচম, ফরিদপুরের মালাই সর, বরিশালের গটিয়া সন্দেশ ও আদি রসগোল্লা, দিনাজপুরের গুড় ক্ষীরমোহন, রংপুরের হাবসি হালুয়া, রাজশাহীর রসকদম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালো তিল কদম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা ও ক্ষীর তক্তি, পাবনার ইলিশপেটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি ইত্যাদি।

প্রতিটি মিষ্টির দোকানের নিজস্ব কারখানা রয়েছে। সে সব কারখানায় মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফিল্টের হাটে কাইয়ুম মিষ্টান্ন ভান্ডারের কারখানায় যায়। কারখানায় ঢুকতেই দেখি বড়বড় দুটি চুলোতে আগুনের তাপে গড় গড় করে মিষ্টি গরম হচ্ছে। মানে তৈরি হচ্ছে মিষ্টি। পরে কথা হয় মিষ্টির কারিগর অরুণ ও রঞ্জিত আর মালিক মোস্তফা কামাল ও কাইয়ুম এর সাথে।

তাঁরা জানান, প্রায় ১০-১২ বছর ধরে এখানে মিষ্টির ব্যবসা করে আসছেন। প্রতিদিনের চাহিদা মোতাবেক তাঁরা মিষ্টি বানান। আর ওর্ডার পেলেতো কথাই নেই আরো বেশি পরিমানে মিষ্টি বানাতে হয়। কারিগর অরুণ জানান, আমাদের এখানে নানা রকমের মিষ্টি বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে রসগোল্লা, চমচম, পঞ্জ, ছানা জিলাপি, কালোজাম, লালমুন, রসমালাই। এর ভেতর শাহী চমচম এর কদর খুব বেশি। এ মিষ্টির দামাটাও অনেক। ২৫০ টাকা কেজি।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খোলা থাকে এসব দোকান। দোকানে প্রায় মহিলাসহ ২০ জন কাজ করেন। রঞ্জিত, আব্দুল গণি, অরুণ, শাহাবুদ্দীন, সবুর, আল আমিন, আরমান, রাইহান, রনি, ফরহাদ, হৃদয়, মিঠু, সালাম, জনি, আফসার, ইউসুফ, রিপন এদের সবার সাথে কথা বলে জানলাম এরা সবাই এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করে খুশি। মহাজন তাঁদের মজুরিসহ নানা রকম সুযোগ সুবিধা প্রদান করে থাকেন। সবার সাথে কথা বলার পর তাঁদের বিখ্যাত ১ টা শাহী চমচম খেয়ে বিদায়নি মিষ্টির কারখানান থেকে।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

ব্রেকিং নিউজঃ