চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

চার বছর ধরে ক্লাস না করেই বেতন নিচ্ছেন অধ্যক্ষের স্ত্রী

0

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের চাটাইডুবী আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, স্বেচ্ছারিতা ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অধ্যক্ষ মো. মজিবুর রহমানের দাপটে মাদ্রাসার শিক্ষকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। একই কারণে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট ও নানা কারণে অচল অবস্থা দেখা দিয়েছে। অধ্যক্ষের এমন আচরণে চরম ক্ষুব্ধ মাদ্রাসার অন্য শিক্ষকরাও।

সম্প্রতি ওই প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ নিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও অধ্যক্ষের মধ্যে দ্ব›দ্ব চলছে। অধ্যক্ষ মোটা অংকের টাকা নিয়ে স্থানীয় এক নারী নেত্রীর জামাইকে চাকুরি দিতে সব রকম চেষ্টা করছেন। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য করে সাক্ষর করেননি মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আলাউদ্দীন। এ বিষয়ে এক কলেজ ছাত্র ১৫ জন স্থানীয় ব্যক্তির সাক্ষর নিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।

জানা গেছে, চাটাইডুবী আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ক্ষমতার দাপটে নিয়োগ বিধিমালা ভঙ্গ করে ক্ষমতাসীন দলের এক নারী নেত্রীর জামাইকে নিরাপত্তা প্রহরী পদে চাকরি দিতে সাড়ে আট লাখ টাকা নিয়েছেন। এর আগেও একাধিক শিক্ষক নিয়োগে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়েছেন এমন অভিযোগ মাদ্রাসার সাথে সংশ্লিষ্টদের। স্থানীয় এক নারী নেত্রীর সাথে গোপন আঁতাত করে প্রতিষ্ঠানটিতে রামরাজত্ব চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন এলাকার সচেতন মহল।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই পিয়ন পদে কর্মরত ছিলেন চাটাইডুবীর রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি অবসরে। অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন রফিকুল ইসলামের এক ছেলেকে চাকুরি দেয়ার জন্য সুপারিশ করেন স্থানীয়রা। তবে স্থানীয়দের সুপারিশ উপেক্ষা করে অধ্যক্ষ এক নারী নেত্রীর জামাইকে চাকুরি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, অধ্যক্ষ মজিবুর রহমান ২০০৮ সালের ৬ জানুয়ারি দাখিল স্তরের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন সুপারিনটেনডেন্ট পদ থেকে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। একই বছর ১ জুলাই তিনি আলিম স্তরের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করে অদ্যবধি কর্মরত রয়েছেন।

জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালে মো. মজিবুর রহমান সুপার হওয়ার পর থেকে ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। ইতিপূর্বে তিনি তার স্ত্রীসহ ৫ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। এমনকি আলিম স্তরে ব্যয়ভার নির্বাহের কথা বলে তার স্ত্রীকে নিয়োগ দেন। বর্তমানে তিনি তার স্ত্রীর বেতন থেকে ৮ হাজার টাকা মাদ্রাসায় জমা দেন এবং ৯ হাজার টাকা নিজে নেন। তার স্ত্রী সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসেবে ২০১৫ সালের ৪ জুন যোগদান করে আজ অবধি কোনদিন মাদ্রসায় আসেননি। শিক্ষক হাজিরা খাতায় তার স্ত্রীর বদলে নিজেই স্বাক্ষর করেন অধ্যক্ষ। স¤প্রতি ওই মাদ্রাসায় একজন নিরাপত্তা প্রহরী পদে নিয়োগদানের জন্য জনৈক ব্যক্তির কাছে ৮-৯ লাখ টাকা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বিষয়টি জানতে পেরে ভাইভা বোর্ডের কোন কাগজে স্বাক্ষর না করে বোর্ড বর্জন করেন।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদ্রাসা শিক্ষক জানান, অধ্যক্ষের নানা অনিয়ম, একনায়কতন্ত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে শিক্ষকদের মাঝে অসন্তোষসহ ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকদের সাথে তার অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সচেতন অভিভাবক ও এই প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম মাদ্রাসার অধ্যক্ষের সবধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বন্ধসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। এ প্রতিবেদকের ক্যামেরার সামনে স্থানীয় অনেকেই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়মের কথা তুলে ধরেন।

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ মো. মজিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করলেও তার স্ত্রীর সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষিকা শাহনাজ খাতুনের ক্লাস না করে বেতন নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। এটিকে অনিয়ম স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এটি করা হয়েছে। মোট বেতনের ৯ হাজার টাকা তার স্ত্রী নেন এবং ৮ হাজার মাদ্রাসার আলিম স্তরের জন্য দেয়া হয় বলে জানান তিনি। স¤প্রতি নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগের প্রশ্নে তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়মতান্ত্রিকভাবে হচ্ছে। নিয়োগ বিষয়ে তার এককভাবে তেমন কিছু করার নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চাটাইডুবী আলিম মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আলাউদ্দীন জানান, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তিনি শুনেছেন। ম্যানেজিং কমিটির পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হয়। তাছাড়া উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির ক্ষমতা অনেক। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের জবাবদিহিতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে। তাছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আইনগত এখতিয়ার শিক্ষা বোর্ডের। তবে এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

ব্রেকিং নিউজঃ